ইরানে যুদ্ধের খবর, গাজায় খাদ্য মজুতের হিড়িক

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে গাজা সিটির দেইর আল-বালাহ বাজারে যান হানি আবু ইসা। উদ্দেশ্য ছিল রমজানের জন্য কিছু ইফতারের উপকরণ কেনাকাটা। কিন্তু দোকানের সামনে ভিড় দেখে তিনি বিস্মিত হন। পথচারীদের কাছ থেকে জানতে পারেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তিনি দেখেন, মানুষ কাঁধে আটাভর্তি বস্তা তুলে নিচ্ছে, যে যত বেশি পারছে, খাদ্যপণ্য কিনে মজুত করছে।’
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের খবরে গাজায় সর্বপ্রথম প্রভাব এটাই। বাজারে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়—চিনি, আটা, ভোজ্যতেল, ইস্টসহ নিত্যপণ্যের তাক দ্রুত খালি হতে থাকে, দামও বাড়তে শুরু করে।
পাঁচ সন্তানের বাবা, ৫১ বছর বয়সি হানি আবু ইসা আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমার বিশ্বাস যুদ্ধ সরাসরি গাজাকে প্রভাবিত করবে না। তবে আঞ্চলিক কোনো সামরিক উত্তেজনায় এখন আর গাজার মানুষ শান্ত থাকতে পারেন না। এখানকার মানুষ এখন সবকিছুতেই ভয় পায়। সকাল থেকেই সবাই খাবার মজুত করতে বাজারে ছুটছে। এতে অনেক পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, দামও বেড়েছে।’
যুদ্ধ শুরুর দিন সন্ধ্যায় ইসরায়েলের সরকারি সংস্থা ‘কোগাট’ ফেসবুক পোস্টে জানায়, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে গাজা ও পশ্চিম তীরগামী ক্রসিং ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ বন্ধ থাকবে। এতে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
হানি বলেন, ‘আটা, চিনি, তেল, ইস্ট—সবার আগে এগুলোই বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে।’
ইসরায়েলের আগের যুদ্ধের সময় দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘এক বস্তা আটা কিনতে আমাকে এক হাজার শেকেল দিতে হয়েছিল। আমি সে দিনগুলো আরেকবার দেখতে চাই না।’
তবে তার মতে, সীমান্ত বন্ধ থাকলে মজুত কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তিনি বলেন, ‘পণ্য দ্রুত শেষ হয়ে যায়, আর আমাদের বাসস্থানের অবস্থা এমন যে, অনেক কিছু সংরক্ষণও করা যায় না। আমরা শুধু আশ্বস্ত হতে চাই—এই বন্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না।’
গাজার নুসেইরাত বাজারে মুদি ব্যবসায়ী ওমর আল-গাজালি বলেন, ‘আগের দুর্ভিক্ষ মানুষের মনে গভীর মানসিক আঘাত রেখে গেছে। মানুষের ভয় যৌক্তিক। তারা আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে।’
ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত আট সন্তানের মা আসমা আবু আল-খায়ের গাজা সিটি বাজারে ঘুরছিলেন খালি হাতে। তিনি বলেন, ‘কোথায় রাখব? কী রাখব? রমজানে দৈনিক খাবারই জোগাড় করতে কষ্ট হচ্ছে। আমার জন্য দৈনন্দিন খাবার জোগাড় করাই কঠিন। আর মজুত করা তো প্রায় অসম্ভব।’
জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত মোহাম্মদ দাহের বলেন, ‘আগের দুর্ভিক্ষে আমার অধিকাংশ সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। আমরা এখন এসবে ক্লান্ত। আমি এখন আর মজুত করছি না। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখে গেছি।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমান্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ইরান যুদ্ধের সুযোগে গাজায় আরও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে কিনা।
গাজার ফিলিস্তিনি ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য আলি আল-হায়েক সতর্ক করেছেন, ক্রসিং বন্ধ থাকলে ত্রাণ বিতরণ ও দাতব্য খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। গুরুতর অসুস্থ ও আহতদের বিদেশে চিকিৎসার সুযোগও বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, ‘আগের যুদ্ধের কারণে গাজার অর্থনীতি এরই মধে ৮৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হয়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বেকার, ৯৭ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ।’
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হস্তক্ষেপের আহ্বান করে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, ক্রসিং যেন আবার খুলে দেওয়া হয় এবং মানুষ ও পণ্যের চলাচল নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও সংকটের সুযোগে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করা উচিত নয়—রমজানে এই মানসিকতাটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’
আলজাজিরায় প্রকাশিত মারাম হুমাইদের প্রতিবেদন ‘নট অ্যাগেইন: গাজা রাশেজ টু স্টকপাইল অ্যামিড ইরান ওয়ার, ক্রসিং ক্লোজার’ অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।