ভবিষ্যতে একসঙ্গে বিশ্ব চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন?

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। একইসঙ্গে দেশ দুটি পারমাণবিক শক্তিধরও। দিন দিন ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নিচ্ছে বেইজিং। অনেকেরই ধারণা, আগামীতে যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিয়ে বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে এশিয়ার দেশ চীন। অর্থাৎ বিশ্ব নেতৃত্ব সুদূর আমেরিকা থেকে এশিয়ায় আসবে।
কিছুটা একই ধারণা পোষণ করেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তার মতে, ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতির মূল কেন্দ্র হতে পারে শুধু ওয়াশিংটন ও বেইজিংভিত্তিক। তিনি একে ‘জি২’ বা গ্রুপ অব টু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে চীন এই ধারণার প্রতি খুব বেশি আগ্রহ দেখায়নি। তারা বরং বহু দেশের অংশগ্রহণে একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার কথা বলছে। এই প্রেক্ষাপটে দুই পরাশক্তির সম্পর্ক, সম্ভাব্য বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলেছে এনবিসি নিউজ।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ২০০৫ সালে প্রথম ‘জি২’ ধারণাটি দেন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ সি. ফ্রেড বার্গস্টেন। তার মতে, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এটি মূলত জি৭ বা জি২০’র তুলনায় আরও ছোট ও প্রভাবশালী একটি নেতৃত্ব কাঠামোর ধারণা।
তবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ায় এই ধারণা যুক্তরাষ্ট্রে খুব একটা সমর্থন পায়নি। তারপরও গত শরতে (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) দক্ষিণ কোরিয়ায় চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প আবার ‘জি২’ শব্দটি ব্যবহার করেন। যদিও তিনি স্পষ্ট করেননি এই ব্যবস্থা বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে। চলতি মাসের শেষ দিকে চীন সফরে গিয়ে আবারও শির সঙ্গে তার দেখা করার কথা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের।
চীনের দৃষ্টিতে, ট্রাম্পের ‘জি২’ উল্লেখ তাদের ক্রমবর্ধমান শক্তির স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্ব রাজনীতিতে সমান প্রভাবশালী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো আশঙ্কা করছে, এতে দুই পরাশক্তি একসঙ্গে বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্য দেশগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে।
রোববার বেইজিংয়ে বার্ষিক আইনসভা অধিবেশনের ফাঁকে এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই আশঙ্কা কমানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বে বড় প্রভাব আছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু পৃথিবীতে ১৯০টির বেশি দেশ রয়েছে। বিশ্ব ইতিহাস সবসময় অনেক দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ‘জি২’ ধারণা চীনের জন্য কিছুটা সংবেদনশীল। কারণ গ্লোবাল সাউথে তাদের কূটনৈতিক অবস্থান মূলত এই নীতির ওপর দাঁড়ানো যে, বড় শক্তিগুলো ছোট দেশগুলোর ওপর কর্তৃত্ব করবে না। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকলে বৈশ্বিক নেতৃত্বের বাড়তি দায়িত্ব নিতে চীন অনেক সময় অনাগ্রহীও থাকে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, চীন কখনও আধিপত্য বিস্তার বা অন্য দেশের ওপর কর্তৃত্ব করতে চায় না। তাদের লক্ষ্য হলো ‘সমান ও সুশৃঙ্খল বহুমেরু বিশ্ব’ গড়ে তোলা। তিনি বলেন, ‘ইতিহাস দেখায় যে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ব্লকভিত্তিক সংঘাত সবসময় মানবতার জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। তাই চীন শক্তিশালী হলেও কখনও আধিপত্যের পথ নেবে না। আমরা এটাও মনে করি না যে বিশ্ব কেবল কয়েকটি বড় দেশের দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত।’
বেইজিংয়ে বার্ষিক আইনসভা অধিবেশনের সময় অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন ওয়াং। যদিও প্রশ্নগুলো আগে থেকেই সমন্বয় করা থাকে, তবুও এটি চীনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তাদের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সরাসরি শোনার একটি বিরল সুযোগ।
ওয়াং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের ‘সুদূরপ্রসারী ও বৈশ্বিক প্রভাব’ রয়েছে। তার মতে, দুই দেশ যদি একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, তাহলে ভুল বোঝাবুঝি ও ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়বে। আর যদি সংঘাত বা সরাসরি সংঘর্ষ হয়, তাহলে তার প্রভাব পুরো বিশ্বে পড়তে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে শুল্ক আরোপ করায় যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্ক কিছুটা চাপে পড়লেও, তিনি প্রায়ই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার ‘চমৎকার সম্পর্কের’ কথা বলেন। অক্টোবরের বৈঠকের পর থেকে ট্রাম্প ও শি দুইবার ফোনে কথাও বলেছেন।
ওয়াং বলেন, ‘দুই দেশের প্রেসিডেন্ট উচ্চপর্যায়ে ভালো যোগাযোগ বজায় রেখে উদাহরণ তৈরি করেছেন। এতে চীন–মার্কিন সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সহায়তা মিলেছে এবং উত্থান-পতনের পরও সম্পর্ক আবার ভারসাম্যে ফিরেছে।’
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ও শি চলতি বছর চতুর্থবারের মতো দেখা করতে পারেন। এর শুরু হবে ট্রাম্পের তিন দিনের চীন সফরের মাধ্যমে, যা ৩১ মার্চ থেকে শুরু হওয়ার কথা।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েরও পরে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি তিনি ডিসেম্বরে মিয়ামিতে অনুষ্ঠিতব্য জি২০ শীর্ষ সম্মেলনেও অংশ নিতে পারেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নভেম্বরে শেনজেনে অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, ২০২৬ সাল যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের জন্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ বছর’ হতে পারে। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ও বৈঠকের পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময়ের এজেন্ডা ইতোমধ্যে প্রস্তুত। এখন উভয়পক্ষের উচিত ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা, সম্ভাব্য ঝুঁকি সামলানো এবং অপ্রয়োজনীয় বাধাগুলো দূর করা।’
তবে সম্ভাব্য ট্রাম্প-শি সামিটের পথে একটি বড় বাধা হতে পারে ইরান নিয়ে চলমান সংঘাত। বর্তমানে ইরানে মার্কিন–ইসরায়েলি হামলা চলছে, আর চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। রোববার বেইজিংয়ে ওয়াং আবারও অবিলম্বে সামরিক হামলা বন্ধ করে সংলাপে ফেরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘কারও জন্যই ভালো নয়’।
তার ভাষায়, ‘মধ্যপ্রাচ্যকে আগুনে জ্বলতে দেখা খুবই দুঃখজনক। এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা হওয়ারই কথা ছিল না এবং যা কারও মঙ্গল করে না।’ ওয়াং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও বলপ্রয়োগেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘জঙ্গলের আইন পৃথিবীকে শাসন করতে পারে না। কেবল শক্তি প্রয়োগ করলেই কারও প্রকৃত শক্তি প্রমাণ হয় না।’