যুদ্ধের অজুহাতে আল-আকসায় জুমার নামাজ নিষিদ্ধ করল ইসরায়েল

ইরান যুদ্ধের অজুহাতে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় নিষিদ্ধ করেছে ইসরায়েল। পবিত্র রমজান মাসে ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম এই স্থানে মুসলিমদের প্রবেশাধিকার খর্ব করার ধারাবাহিকতায় এটি ইসরায়েলি প্রশাসনের আরেক বর্বরতম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) এক ঘোষণায় ইসরায়েলি সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিশাম ইব্রাহিম এ বার্তা দিয়েছেন।
শুক্রবার (৬ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
হিশাম ইব্রাহিম জানান, ইরানের প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু আল-আকসা মসজিদই নয়, জেরুজালেমের ওল্ড সিটির সমস্ত ধর্মীয় স্থান—যেমন ওয়েস্টার্ন ওয়াল, টেম্পল মাউন্ট এবং চার্চ অফ দ্য হোলি সেপালকার—সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো ধর্মের উপাসক বা দর্শনার্থী সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন না বলে জানানো হয়েছে এ ঘোষণায়।
শনিবার (৬ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমান জানিয়েছিল, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি ঐতিহাসিক চুক্তির দ্বারপ্রান্তে ছিল দেশগুলো। ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য ইউরেনিয়াম মজুত না করতে সম্মত হলেও শেষ পর্যন্ত আলোচনা ভেস্তে গিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত এই দ্বিমুখী সংঘর্ষে ইসরায়েলে ১১ জন এবং ইরানে অন্তত এক হাজার ২৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনা ও ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানি হামলায় হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
আল-আকসা মসজিদের প্রবীণ ইমাম শেখ ইকরিমা সাবরি ইসরায়েলি এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি একে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেন, দখলদার শক্তি যুদ্ধের দোহাই দিয়ে মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ খুঁজছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ওল্ড সিটির বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী ছাড়া অন্য সবার প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
গত মাসেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিল, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ১০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে রমজানের প্রথম নামাজের জন্য মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না—যা বিগত বছরগুলোতে জমায়েত হওয়া সংখ্যার তুলনায় সামান্যতম অংশ মাত্র। অথচ আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।
ওল্ড সিটি এলাকাটি অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল এই এলাকাটি দখল করে নেয়। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।
সম্প্রতি এই পবিত্র স্থানটি বর্তমানে কট্টরপন্থি ইসরায়েলি রাজনীতিক এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তারা প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ইসরায়েলি বাহিনীর নিরাপত্তায় মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করছে। ফিলিস্তিনিরা আশঙ্কা করছেন, এই পবিত্র স্থানে দখলদারিত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
আল-আকসা প্রাঙ্গণ জর্দান দ্বারা পরিচালিত হলেও এর প্রবেশপথগুলো ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে। কয়েক দশকের পুরোনো ‘স্ট্যাটাস কো’ বা স্থিতাবস্থা অনুযায়ী, ইহুদি এবং অন্যান্য অমুসলিমদের নির্দিষ্ট সময়ে এই প্রাঙ্গণ পরিদর্শনের অনুমতি থাকলেও সেখানে তাদের প্রার্থনা করা বা ধর্মীয় প্রতীক প্রদর্শন করা নিষিদ্ধ।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বারবার আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইহুদিদের প্রার্থনার অধিকারের দাবি জানিয়েছেন এবং বর্তমান স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। ২০২৪ সালে তিনি এমনকি মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি সিনাগগ (ইহুদি উপাসনালয়) নির্মাণের ঘোষণাও দিয়েছিলেন।