ইরানকে অস্ত্র না দিতে শি জিনপিংকে ট্রাম্পের চিঠি

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানকে অস্ত্র না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জবাবে ফিরতি চিঠিতে চীনা প্রেসিডেন্ট তাকে জানিয়েছেন, চীন তেহরানকে কোনো অস্ত্র দিচ্ছে না।
ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানায়, মঙ্গলবার রেকর্ড করা ওই সাক্ষাৎকারে চিঠি আদান-প্রদানের নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করেননি ট্রাম্প। ফক্স বিজনেস নেটওয়ার্কের ‘মর্নিংস উইথ মারিয়া’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘আমি শি জিনপিংকে একটি চিঠি লিখে অনুরোধ করেছি, তিনি যেন ইরানকে অস্ত্র না দেন। ফিরতি চিঠিতে তিনি আমাকে জানিয়েছেন, তারা ইরানকে অস্ত্র দিচ্ছেন না।’
আগামী মাসে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ট্রাম্পের মতে, ইরান যুদ্ধ বা ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব তেলের বাজারে যে পরিবর্তন আসছে, তা এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তিনি বলেন, ‘চীনের তেলের প্রয়োজন আছে, আমাদের নেই।’
সাক্ষাৎকারের পর নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালি স্থায়ীভাবে খুলে দিচ্ছেন, যা নিয়ে চীন খুবই খুশি। তিনি লিখেছেন, ‘আমি এটা তাদের জন্য এবং বিশ্বের জন্য করছি। কয়েক সপ্তাহ পর আমি যখন চীনে পৌঁছাব, প্রেসিডেন্ট শি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরবেন।’
তবে হোয়াইট হাউস থেকে প্রেসিডেন্টের এই পোস্টের ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। কেননা, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখনো তেলবাহী জাহাজের চলাচল সীমিত।
পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে প্রথম দফার আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় আরব সাগরে নৌ অবরোধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এই অবরোধ না মেনে সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েছে চীনের মালিকানাধীন তেলবাহী ট্যাংকার। এই ঘটনার পর ইরান থেকে চীনের তেল আমদানির পথ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলছেন, ইরান থেকে তেল আমদানি করতে পারবে না চীন। হরমুজ প্রণালিতে তারা ইরানি তেলবাহি ট্যাংকারগুলোকে বাধা দেবে। চীন অন্য তেল পেতে পারে, কিন্তু ইরানি তেল না।
ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে পরিচিত চীনের সমালোচনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী। বেইজিংকে একটি ‘ভারসাম্যহীন বৈশ্বিক অংশীদার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি অভিযোগ করে বলেন, চীন আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে তেল মজুত করছে। এ ছাড়া তারা নিজস্ব কিছু পণ্যের রপ্তানি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সীমিত রাখছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে ইতোমধ্যে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে আগামী মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কথা রয়েছে। বর্তমান এই কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা সেই সফরকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে কিনা বা এই সফরকে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত করবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে বেসেন্ট সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।
স্কট বেসেন্টের মন্তব্যের পর ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানি বন্দরগুলোতে প্রবেশকারী বা সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া যে কোনো দেশের জাহাজের ওপর এই অবরোধ সমানভাবে কার্যকর হবে। এতে কোনো দেশকেই বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে না।
এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের উপকূলীয় এলাকায় এই অবরোধ নিশ্চিত করতে ইউএস নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিটি ডেস্ট্রয়ারে ৩০০-এর বেশি উচ্চ প্রশিক্ষিত নাবিক মোতায়েন রয়েছে। তারা যে কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক বা রক্ষণাত্মক নৌ-অভিযান পরিচালনায় সক্ষম। মূলত ইরানের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে চাপে রাখতে ওয়াশিংটনের এই কঠোর পদক্ষেপ।
যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা অবরোধের তীব্র সমালোচনা করেছে বেইজিং। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে সামরিক তৎপরতা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যেন বিশ্ব অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে না দেয়, সেদিকে নজর দেওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) একটি চার দফা শান্তি প্রস্তাব পেশ করেছেন। তার এই প্রস্তাবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আন্তর্জাতিক আইনের শাসন মেনে চলা এবং নিরাপত্তা ও উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চীন দাবি করেছে, তারা এই সংকট নিরসনে শুরু থেকে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে।
সোমবার আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধ ভঙ্গ করে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েছে চীনের মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজ। ফলে সোমবার (১৩ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায় শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।