ধর্ষকের ২১ হাজার ২৫০ বছর কারাদণ্ডের যে ঘটনা ইতিহাসের সর্বোচ্চ শাস্তি

ধর্ষণ, অপহরণ ও পাশবিক নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের বিচারের অনেক কঠিন দৃষ্টান্ত রয়েছে। এমন অপরাধের ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা ঠিক কতটা কঠোর রূপ ধারণ করতে পারে, তার এক অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৯৩ সালে ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের একটি বিচার আজও পৃথিবীতে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
ওই বছর এক রোমহর্ষক অপরাধের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হয় অ্যালান ম্যাকলরিন নামের এক ব্যক্তি। বাড়িতে ঢুকে এক বৃদ্ধ নারীকে ধর্ষণ করে সে ও তার সহযোগী। এ জন্য আদালত তাকে সর্বমোট ২১ হাজার ২৫০ বছরের কারাদণ্ড দেন। বিশ্বের আইনি ইতিহাসে কোনো একক ব্যক্তির জন্য এটি অন্যতম দীর্ঘতম সাজার রেকর্ড, যা আজও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
ওই ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত অ্যালান ম্যাকলরিন। তার প্রধান সহযোগী ছিল ড্যারন বেনেফোর্ড অ্যান্ডারসন। দুজনে মিলে এক বয়স্ক নারীর বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে। এরপর তারা ওই নারীকে জিম্মি করে এবং মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ভয় দেখায়। ওই নারীর ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে ব্যাপক লুটপাট চালায় তারা।
তবে শুধু সশস্ত্র ডাকাতিতেই ক্ষান্ত হয়নি, অসহায় ওই নারীর ওপর দফায় দফায় চালানো হয় পৈশাচিক যৌন নির্যাতন। এই ঘটনার নির্মমতা ও পাশবিকতা সে সময় শুধু তুলসা শহর নয়, গোটা যুক্তরাষ্ট্রকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
গ্রেপ্তারের পর ম্যাকলরিনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, সশস্ত্র ডাকাতি, অপহরণ এবং মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে হামলার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য, বিশেষ করে ওকলাহোমার বিচারব্যবস্থায় একটি বিশেষ নিয়ম রয়েছে। জুরি বোর্ড চাইলে প্রতিটি ভিন্ন অপরাধের জন্য আলাদা আলাদা শাস্তির সুপারিশ করতে পারেন এবং বিচারক সেই সাজাগুলো একসঙ্গে না চালিয়ে, একটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অন্যটি শুরু হওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।
এই মামলার ক্ষেত্রে জুরিদের সুপারিশ অনুযায়ী, বিচারক ম্যাকলরিনকে প্রতিটি জঘন্য অপরাধের জন্য শত শত বা হাজার বছরের সাজা দেন। সব অপরাধের সাজা যোগ করে সর্বমোট ২১ হাজার ২৫০ বছর নির্ধারণ করা হয়। পরে উচ্চ আদালতে আপিলের মাধ্যমে তার সাজা থেকে ৫০০ বছর কমানো হয়, যার ফলে চূড়ান্ত সাজা দাঁড়ায় ২০ হাজার ৭৫০ বছর।
এই চাঞ্চল্যকর মামলার আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো ম্যাকলরিনের সহযোগী ড্যারন অ্যান্ডারসনের বিচার। অ্যান্ডারসনকে প্রথম বিচারে আদালত ২ হাজার ২০০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু এই সাজার বিরুদ্ধে সে আপিল করে এবং পুনরায় বিচারের আবেদন জানায়। আদালত তার আবেদন মঞ্জুর করে নতুন করে বিচার শুরু করেন।
তবে নতুন বিচারে অপরাধের ভয়াবহতা জুরিদের সামনে আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। ফলে বিচারক তার সাজা কমানোর বদলে এক লাফে বাড়িয়ে ১১ হাজার ২৫০ বছর নির্ধারণ করেন। আইনি ইতিহাসে আপিল করে সাজা বৃদ্ধির এটি একটি বিরল উদাহরণ।
মানুষের গড় আয়ু যেখানে সীমিত, সেখানে হাজার হাজার বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রতীকী সাজা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজকে একটি অত্যন্ত কঠোর বার্তা দেওয়া।
আদালত নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে, কোনো ধরনের প্যারোল বা আইনি ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে এই অপরাধীরা যেন কখনোই আর মুক্ত পৃথিবীতে ফিরে আসতে না পারে। এ ধরনের চরম অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের 'জিরো-টলারেন্স' নীতির জ্বলন্ত প্রমাণ এই রায়।
