মেটা ও ইউটিউবকে ৭৩ কোটি টাকা জরিমানা

শৈশবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত হয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির শিকার হওয়ায় মেটা ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে মামলা করেন আমেরিকার ক্যালি নামের এক তরুণী। লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি আদালত দীর্ঘ পাঁচ সপ্তাহের বিচারকার্য শেষে এ মামলার রায় দিয়েছেন। যেখানে ওই তরুণীকে ৬০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৭৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
মামলার রায়ে জুরি বোর্ড দেখতে পেয়েছেন ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মালিকানাধীন মেটা এবং ইউটিউবের মালিকানাধীন গুগল ইচ্ছাকৃতভাবে এমন আসক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা ২০ বছর বয়সি ওই তরুণীর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করেছে।
জুরি বোর্ড নির্ধারিত জরিমানার অর্থে ৩০ লাখ ডলার ক্যালির মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির জন্য। বাকি ৩০ লাখ ডলার শাস্তিমূলক জরিমানা হিসেবে ধার্য করা হয়েছে।
জুরিদের মতে, এই প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো ‘বিদ্বেষ ও জালিয়াতির’ মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করেছে। এই জরিমানার ৭০ শতাংশ মেটা এবং ৩০ শতাংশ গুগলকে পরিশোধ করতে হবে।
আরও পড়ুন: মেটাকে ৩৭৫ কোটি ডলার জরিমানা
ক্যালি জানান, তিনি মাত্র ৯ বছর বয়সে ইনস্টাগ্রাম এবং ৬ বছর বয়সে ইউটিউব ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু বয়সের কারণে পরিবার তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেনি। ক্যালি তার সাক্ষ্যে বলেন, আমি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কারণ, আমার পুরো সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটতো।
তিনি জানান, ১০ বছর বয়স থেকেই তিনি উদ্বেগ এবং বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। বছরখানেক পর থেরাপিস্টরা এই সমস্যাকে রোগ হিসেবে শনাক্ত করেন। এ ছাড়া তিনি নিজের শারীরিক গঠন, যেমন—ইনস্টাগ্রাম ফিল্টার ব্যবহার করে নিজের নাক ছোট ও চোখ বড় দেখানোর নেশায় মেতে ওঠেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে জুরির সামনে উপস্থিত হয়ে মেটার চেয়ারম্যান ও সিইও মার্ক জাকারবার্গ তার কোম্পানির দীর্ঘদিনের নীতির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ১৩ বছরের কম বয়সি ব্যবহারকারীদের কোনো প্ল্যাটফর্মে অনুমতি দেওয়া হয় না।
তবে ক্যালির আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন, মেটা এবং ইউটিউব আসলে ‘আসক্তির যন্ত্র’ তৈরি করেছে এবং শিশুদের তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করা ঠেকানোর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।
মেটা এবং গুগল পৃথক বিবৃতিতে এই রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে এবং আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে। মেটা জানিয়েছে, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য অত্যন্ত জটিল বিষয় এবং এটি কেবল একটি অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না।
অন্যদিকে গুগলের মুখপাত্র বলেছেন, এই মামলাটি ইউটিউবকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে; এটি একটি দায়িত্বশীল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, সোশ্যাল মিডিয়া সাইট নয়।
বুধবার (২৫ মার্চ) রায় ঘোষণার সময় আদালতের বাইরে অপেক্ষায় থাকা অনেক অভিভাবককে উল্লাস করতে দেখা যায়। অ্যামি নেভিল নামের এক মা, যার সন্তানও সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতির শিকার। তিনি অন্য অভিভাবকদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এই রায়কে তারা সাধারণ মানুষের জয় হিসেবে দেখছেন।
এর আগে মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) মেটা প্ল্যাটফর্মসকে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানা করেছে নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত। মেটার মালিকানাধীন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে শিশুদের যৌন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া এবং ব্যবহারকারীদের এ সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার দায়ে এ রায় ঘোষণা করা হয়।
রয়টার্স জানায়, নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়ের করা মামলার অভিযোগে বলা হয়, মেটা জেনেশুনে তাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে শিশুদের যৌন নিগ্রহ ও হয়রানির সুযোগ উন্মুক্ত রেখেছে এবং অ্যাপগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে গ্রাহকদের প্রতারিত করেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বন্ধ বা সীমিত করার জন্য বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যুক্তরাজ্য বর্তমানে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার একটি পাইলট প্রোগ্রাম চালাচ্ছে।
ফরেস্টারের রিসার্চ ডিরেক্টর মাইক প্রুলক্স বলেন, পরপর এই রায়গুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি এবং জনগণের মধ্যে একটি ‘ব্রেকিং পয়েন্ট’ বা চরম সীমা নির্দেশ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বছরের পর বছর ধরে তৈরি হচ্ছিল এবং এখন এটি অবশেষে ছড়িয়ে পড়েছে।