যুদ্ধের প্রথম শিক্ষা হলো শত্রু চেনা, আর ব্রিটেনের শত্রু ট্রাম্প

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ আজ দশম দিনে গড়িয়েছে। সত্যি বলতে কোনো বৈধ ও যৌক্তিক কারণ ছাড়াই এ যুদ্ধ শুরু হয়েছে, এবং যত দিন গড়াচ্ছে যুদ্ধ ততোই অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠছে। এর মধ্যে সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার উপকূলে ইরানি নৌবাহিনীর একটি জাহাজে টর্পেডো হামলা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প দেখিয়ে দিয়েছেন, তার জন্য সমগ্র বিশ্বই যুদ্ধক্ষেত্র। আর কূটনীতি জিনিসটা তো যৌথ বিমান হামলায় বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গেই শেষ করে দিয়েছে ওয়াশিংটন। ওই হামলায় হতাহত হয়েছেন শত শত ইরানি নাগরিক।
ইদানীং ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ যেন পাগলাগারদে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের লক্ষ্য প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছে। একজন খামখেয়ালি প্রেসিডেন্টের হঠাৎ মনে হলো, তাকে ইরানের শাসনকাঠামো বদলানোর মহান দায়িত্ব নিতে হবে। আর অমনি তিনি যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। সঙ্গে তার ‘যুদ্ধসচিব’ পেট হেগসেথ তো আছেনই। সর্বক্ষণ নির্মমতা নিয়ে উন্মত্ত বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
তবে দশ দিনের যুদ্ধে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, ইরানে যেসব নেতাকর্মী এখনো বেঁচে আছেন, তারা ‘ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা অভ্যুত্থানের’ পুনরাবৃত্তি হিসেবে সহজে আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছেন না। যদিও কম সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, তবু তাদের বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে আঘাত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের এ হামলা চমক নয়। তারা আগেই বলেছিল, পরেরবার আক্রমণ হলে এটি আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে চলে যেতে পারে।
এদিকে ট্রাম্প তো এখন মার্কিন মিত্রদের সঙ্গেও যুদ্ধরত। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘আমাদের সাথে না থাকলে আমাদের শত্রু’ নীতি অনুসরণ করছেন ট্রাম্প। উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, এবং নিষ্ঠুরভাবে ক্ষতবিক্ষত লেবানন—চায়, এই যুদ্ধ শেষ হোক। ব্রিটেন ও ইউরোপ সাধারণত এতে অংশ নিতে চায় না, কিন্তু তাদেরও টান দেয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ট্রাম্পের বিশ্বজোড়া যুদ্ধে কোনো নায়ক নেই, সবাই আসলে ভুক্তভোগী। তবে স্পেনের সাহসী নেতা পেড্রো সানচেজ একমাত্র ব্যতিক্রম।
এরই মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত। অচিরেই তার সঙ্গে ট্রাম্পকেও ইরানের স্কুলে বোমা হামলা করে কয়েকশ শিশু হত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মুখোমুখি হতে হবে।
যুক্তরাজ্য এবং অন্যসব সরকার, যারা এখনো জাতিসংঘের চার্টার, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনকে সম্মান করে, তাদের উচিত এই অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা, শাস্তি দেয়া। এমনকি তাদের দেশকেও শাস্তির আওতায় আনা উচিত। অনেক আমেরিকান ও ইসরায়েলি তাদের নেতাদের উন্মাদ আচরণের নিন্দা জানায়। তবু এই দুই দুষ্ট ব্যক্তি তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই এটা প্রমাণিত যে, ট্রাম্প ব্রিটেনের বন্ধু নন। সম্প্রতি ইরানে হামলার বিষয়টিও ট্রাম্প আগে থেকে ব্রিটেনকে জানাননি। এ থেকে আরো পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, ট্রাম্প ও তার প্রশাসনকে এখন ব্রিটেনের শত্রু হিসেবে গণ্য করা উচিত।
খেয়াল করুন, যুক্তরাষ্ট্র (ইউক্রেনে রাশিয়ার মতো) একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবৈধ আগ্রাসন যুদ্ধ শুরু করেছে। ইরানের হুমকির দাবির কোনো প্রমাণও তারা দেখাতে পারেনি। তাদের সশস্ত্র বাহিনীও চলছে কোনো নিয়মবিধি ছাড়াই। নৈতিক ও আইনি বিবেচনা ভূলুণ্ঠিত। একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে তারা প্রকাশ্যে হত্যা করেছে। তারা যে ইসরায়েলের মতো একটি বেআইনি রাষ্ট্র, এবং যেকোনো শত্রু, বা অন্তত ব্রিটেনের জন্য যে তারা হুমকি, মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই ধ্বংসযজ্ঞ, এই হত্যাযজ্ঞ, লাখো মানুষকে আতঙ্কিত ও বাস্তুচ্যুত করা, একই সঙ্গে বাণিজ্য, ভ্রমণ ও জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করা—আর কত প্রমাণ লাগবে?
ইরানকে ছাইয়ে পরিণক করায় ব্রিটেনের কোনো স্বার্থ নেই। এমনকি তেহরানের শাসন যতোই নিকৃষ্ট হোক, তাদের অপসারণেও ব্রিটেনের স্বার্থ নেই। ইরানও ইরাকের মতো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলে ব্রিটেনের তাতে দুই পয়সারও লাভ নেই। এর ফলে বরং উদ্বাস্তুর স্রোত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের চেয়ে দশগুণ বড় হবে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, আইনের শাসন ও যুদ্ধ আইন না মেনে হামলা করা, বিশ্বের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করায় ব্রিটেনের কোনো স্বার্থ থাকতে পারে না।
ট্রাম্পের সর্বশেষ অপরাধগুলো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের পরপরই প্রকাশ হতে শুরু করেছে—গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, যা বিশ্বস্ত ন্যাটো মিত্রের সার্বভৌম অঞ্চল, ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কথাবার্তা চালিয়ে মার্কিন পারমাণবিক শক্তি হঠাৎ বাড়ানো, জলবায়ু সংক্রান্ত জাতিসংঘের পদক্ষেপ বন্ধ করা, বিশ্বব্যাপী শাস্তিমূলক বাণিজ্য শুল্ক আরোপ, ইউরোপের চরম ডানপন্থী দলগুলোর সহায়তা এবং সবচেয়ে তিক্ত—ইউক্রেনের প্রতি অক্ষমতা এবং রাশিয়ার সঙ্গে আপস। এই সমস্ত কার্যক্রম ব্রিটিশ জনগণ এবং রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।
ওয়াশিংটনের মতো নয়, ধারাবাহিক ব্রিটিশ সরকাররা ১৯৭৯ সালে মার্কিন সমর্থিত শাহকে উৎখাত করা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে সংলাপ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনায় অনুপস্থিত ছিল। ফলস্বরূপ, সমসাময়িক ইরানের বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই নেই। তারা মনে করছে, ইরান সরকার ও তাদের প্রক্সি মিলিশিয়াগুলো বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু এটা তাদের ভুল ধারণা। ২০১৫ সালে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেছিলেন ট্রাম্প। তবে এতে করে তেহরানের তেমন কিছুই আসলে হয়নি। কেননা, একটি দেশের দেশের দরিদ্রতা যত বেশি, সামাজিক চাপ তত বেশি, কঠোর ধর্মীয় ও সামরিক অংশীদারদের নিয়ন্ত্রণ তত শক্তিশালী। অন্তত আংশিকভাবে, আজকের ইরান মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই সৃষ্টি।
ইরানের জন্য জরুরি নতুন সূচনা প্রয়োজন। তার নিহত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির প্রতীকী ধর্মতন্ত্র অনেক আগেই শেষ হয়েছে। অনেক ইরানি, সম্ভবত অধিকাংশ, উন্মুক্ত, স্বাধীন, সমৃদ্ধ, বহুবিধ, পশ্চিমমুখী সমাজের প্রতি আগ্রহী। কিন্তু এই ধ্বংসাত্মক, অপরিকল্পিত মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের প্রত্যাশাকে স্তব্ধ করে এবং বিভাজনকে ত্বরান্বিত করে।
অনেকে বলেন, ব্রিটের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংগ্রহের কাজে এত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত যে ইরান বিষয়ে তাদের সঙ্গে দ্বিমত করা প্রায় অসম্ভব। তারা আসলে হতাশাবাদী। ব্রিটেন তার দীর্ঘ ইতিহাস অনেক সময় উচ্চ শর্তযুক্ত আমেরিকান সহায়তা ছাড়াই চালিয়ে এসেছে। এবং তারা চাইলে এটা এখনো করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি যুক্তরাজ্যের ট্রাইডেন্ট পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র সাবমেরিন সংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করা হয়, যেটা মূলত মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল, তাহলে আসলে ভালোই হবে। কেননা, এই সংযোগ ট্রাম্পের মতো যুদ্ধপাগল ব্যক্তিকে সাহস যোগায়। এসব ব্যবহারের সময় আসার আগে এ থেকে মুক্তি পাওয়াই তো ভালো।
যুদ্ধের দশম দিন চলমান। আর কতক্ষণ চলবে এ ধ্বংসযজ্ঞ? এ পরিস্থিতিতে এখনই হামলা বন্ধ করতে হবে। ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও ভ্লাদিমির পুতিনের মতো স্বৈরাচারী সহযোগীদের দ্বারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইন ও স্বাধীনতার ওপর থাকা হুমকি ক্রমাগত বাড়ছে।
ব্রিটেনের কিয়ার স্টার্মার একজন সজ্জন ব্যক্তি। তাকে খামোখা উপহাস করা হয়েছে। তাকে বলব, যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ—আপনার শত্রুকে চিনুন, এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিন।
লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক পরামর্শক
গার্ডিয়ানে প্রকাশিত “দ্য ফার্স্ট লেসন অব ওয়ার ইজ ‘নো ইয়োর এনেমি’—অ্যান্ড ব্রিটেন’স এনেমি নাউ ইজ ডোনাল্ড ট্রাম্প” শীর্ষক কলাম অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]