উত্তর কোরিয়ার ওপর খবরদারি কমাচ্ছে পেন্টাগন

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার দেশ উত্তর কোরিয়ার বৈরিতা দেখেছে বিশ্ব। সময় সময় উত্তেজনার পারদ উঠেছে তুঙ্গে। তবে এবার গলতে শুরু করেছে দুদেশের বরফ। উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে কড়া নজরদারি সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক নীতিগত নথিতে এই সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য উদ্বেগ বৃদ্ধি করবে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান শনিবার (২৪ জানুয়ারি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, পিয়ংইয়ংকে প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে ‘আরও সীমিত’ ভূমিকা পালন করবে।
পেন্টাগনের ওই নথি অনুযায়ী, বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার সামরিক হুমকি মোকাবিলায় যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। আর চলতি বছর দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট ৭.৫ শতাংশ বাড়িয়েছে।
পেন্টাগনের নীতিনির্ধারণী নথি ন্যাশনাল ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিতে বলা হয়েছে, ‘গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরও কম মার্কিন সহায়তার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে প্রতিরোধ করার মূল দায়িত্ব নিতে সক্ষম দক্ষিণ কোরিয়া।’ নথিতে আরও বলা হয়, ‘দায়িত্বের ভারসাম্যে এই পরিবর্তন কোরীয় উপদ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান হালনাগাদ করার ক্ষেত্রে আমেরিকার স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনাদের ভূমিকা আরও নমনীয় করার আগ্রহ রয়েছে, যাতে তারা কোরীয় উপদ্বীপের বাইরে বৃহত্তর হুমকির মোকাবিলায় কাজ করতে পারে। যেমন তাইওয়ান রক্ষা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব মোকাবিলা।
যদিও দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন সেনাদের ভূমিকা পরিবর্তনের বিষয়টির বিরোধিতা করে আসছে, তবুও গত দুই দশকে দেশটি নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। যাতে তারা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র–দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ বাহিনীর কমান্ড দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার সেনা রয়েছে।
ওয়াশিংটনের ভাষায় এই পরিবর্তনটি ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে তথাকথিত ‘জোট আধুনিকায়নের’ অংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অধিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি বিদেশি সেনা ছাড়া আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা অসম্ভব—এমন ‘নতজানু মানসিকতা’র সমালোচনা করেন।
শনিবার এক বিবৃতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোরিয়ায় মোতায়েনকৃত মার্কিন সেনারা (ইউএস ফোর্সেস কোরিয়া) এখনো দ্বিপক্ষীয় জোটের মূল ভূমিকায় রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসন প্রতিরোধে তাদের এই ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।
তবে পেন্টাগনের নথিতে কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। এটি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নথি, যেখান থেকে এই শব্দ বাদ দেওয়া হলো। এর আগে বাইডেন প্রশাসন ২০২২ সালে ‘সম্পূর্ণ ও যাচাইযোগ্য নিরস্ত্রীকরণ’-কে স্পষ্ট লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন হয়তো উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার সম্পূর্ণ বিলোপের বদলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার দিকেই বেশি ঝুঁকছে।
প্রতিটি নতুন প্রশাসনের সময় প্রকাশিত এই বিশদ নীতিগত নথিতে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্ষেত্রে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চীন যেন আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে সে বিষয়টিই পেন্টাগনের প্রধান লক্ষ্য।
তাইওয়ানের নাম উল্লেখ না করে প্রায় ২৫ পৃষ্ঠার ওই নথিতে বলা হয়, ‘এর জন্য সরকার পরিবর্তন বা কোনো অস্তিত্বগত সংঘাতের প্রয়োজন নেই। বরং এমন একটি স্থিতিশীল শান্তি প্রক্রিয়া, যা আমেরিকানদের জন্যও অনুকূল হবে এবং একই সঙ্গে চীনও তা মেনে নিয়ে এর আওতায় বসবাস করতে পারবে।’
গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ানকে চীন নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। এমনকি দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে চীন বলপ্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি। অন্যদিকে তাইওয়ান বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবি এই বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে যে, তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল সেখানকার জনগণেরই রয়েছে।