এবার মধ্যেপ্রাচ্যের আরেক দেশের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে ইসরায়েল

তেহরানের সঙ্গে সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টার মধ্যেই মধ্যেপ্রাচ্যের আরেক দেশ তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে ইসরায়েল।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) তুরস্ককে নতুন প্রতিপক্ষ হিসেবে ইসরায়েল চিহ্নিত করতে চাইছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তিনি বলেন, ‘শত্রু ছাড়া টিকে থাকতে না পারা ইসরায়েল ইরানের পর তুরস্ককে নতুন প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইতে পারে।’ এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা।
সম্প্রতি ইউরেশিয়ার দেশ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানকে উদ্দেশ করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার ওই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানায় আঙ্কারা। ইসরায়েলকে শায়েস্তা করতে আক্রমণের ইঙ্গিত দিয়ে এরদোয়ান বলেন, আমরা যেভাবে লিবিয়া ও কারাবাখে প্রবেশ করেছি, সেভাবেই ইসরায়েলেও প্রবেশ করতে পারি। এটা না করার কোনো কারণ নেই। তার এই হুমকির পর এই মন্তব্য করলেন ফিদান।
রাষ্ট্রায়াত্ত সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিদান আরও বলেন, শনিবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো না গেলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর বিষয়ে ‘আন্তরিক’ রয়েছে। আমি মনে করছি, পারমাণবিক বিষয়টি যদি ‘হয় সব পাবে, নয়তো কিছুই পাবে না’ এমন পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়ায়, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে, তাহলে আমরা গুরুতর বাধার সম্মুখীন হতে পারি।
কুদস মিডিয়ার দাবি, তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সরকার ও গণমাধ্যমের উসকানির তীব্রতা বেড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে আঙ্কারাকে বাদ দেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট আহ্বান জানানো হচ্ছে। তেল আবিবের নিরাপত্তা মহল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জোটের প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া ‘নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা’কে দুর্বলে তুরস্ক কাজ করছে বলে অভিযোগ তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি নৌ গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান জেনারেল অমিত জাগুর দাবি করেছেন, এরদোয়ানের নেতৃত্বকে মোকাবিলা করার সময় এসে গেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে জাগুর মনে করেন, তুরস্কের পদক্ষেপগুলো এখন আর শুধু রাজনৈতিক বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা এই অঞ্চলে ইসরায়েলি ও আমেরিকান স্বার্থকে লক্ষ্য করে সরাসরি সামরিক হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
সাবেক এই নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, এরদোয়ানের সাম্প্রতিক বক্তব্য ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষায় তুরস্কের সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার ইঙ্গিত। এটা প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণারই নামান্তর। জাগুর ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সচিবদের প্রতি এই হুমকি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত শনিবার পাকিস্তানে ২১ ঘণ্টার সরাসরি সংলাপেও কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের প্রস্তাবিত শর্ত মেনে আলোচনার টেবিলে বসে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন মিত্র ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধবিরতির শর্ত মানতে রাজি হয়নি। ফলে ইলামাবাদ সংলাপে আশানুরূপ ফল পাওয়ার বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। যদিও শেষ পর্যন্ত চুক্তি ছাড়াই উভয় পক্ষ দেশে ফিরে গেছে। কিন্তু মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান হাল না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এর আগে, তুরস্কের প্রসিকিউটররা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীসহ ৩৫ জন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। সেখানে সাড়ে চার হাজারের বেশি কারাগারের আবেদন করা হয়েছে। আনাদোলু জানিয়েছে, ইসরায়েলের শীর্ষ নেতা ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, নির্যাতন ও বেআইনিভাবে স্বাধীনতা হরণের অভিযোগ আনা হয়েছে। তুরস্কের বিচারপতি আকিন গুরলেক এই অভিযোগপত্রের প্রশংসা করে এটিকে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেছেন।
এই পদক্ষেপে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নেতানিয়াহু বলেন, ‘এরদোয়ান নিজ দেশের কুর্দি নাগরিকদের গণহত্যা করেছে’। এর পরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে দুই দেশের বাকবিনিয়ম। যদিও এক সময় তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। তাদের মধ্যে শক্তিশালী বাণিজ্য ও ভ্রমণ সম্পর্ক ছিল এই অঞ্চলে চোখে পড়ার মতো। তবে এই সম্পর্কে চিড় ধরে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের আক্রমণের পর। কারণ তুরস্ক স্পষ্টত ফিলিস্তিনের পক্ষ নেয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে ইসরায়েল তার প্রতিবেশী দেশগুলোর আরও ভূখণ্ড জবরদখল করছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। গত ২ মার্চ ইসরায়েলে রকেট ছোড়ার মাধ্যমে হিজবুল্লাহ এই যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়েছে। এরপর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে। তাদের লক্ষ্য লিতানি নদী পর্যন্ত একটি বাফার জোন তৈরি করা, যা লেবাননের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৮ শতাংশ।