logo

ইরানে সংঘাত তীব্র হলে জ্বালানি ও প্রবাসী আয়ে বড় ধাক্কার আশঙ্কা ভারতের

ইরানে সংঘাত তীব্র হলে জ্বালানি ও প্রবাসী আয়ে বড় ধাক্কার আশঙ্কা ভারতের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত দুই সপ্তাহে গড়িয়েছে। প্রথম দফায় হামলা শুরুর পরপরই কৌশলগত সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিশ্বব্যাপী দেখা দিয়েছে তেল ও গ্যাস সংকট। পাশাপাশি উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান পাল্টা হামলা চালানোয় সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। চলমান সংঘাতের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ। ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে এবং গ্যাস সরবরাহেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। 

ইরানে চলমান এই যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে পাকিস্তানের অর্থনীতি পর্যন্ত। তবে এই সংঘাত যদি আরও তীব্র হয়, তবে একটি দেশ অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ চাপের মুখে পড়তে পারে। সে দেশটি হলো ভারত। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটি জ্বালানির জন্য যেমন উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সও তাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

ভারতে ব্যাবহৃত গ্যাসের ৮০ শতাংশের বেশি এবং তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে উপসাগরীয় জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলো সমুদ্রপথে তেল ও এলএনজি পাঠাতে পারছে না। 

ফলে এরই মধ্যে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় পড়েছে ভারত। ফলে সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে সীমিত জ্বালানি সরবরাহের মতো সিদ্ধান্তও নিয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যে রান্নার গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে সাধারণ মানুষকে।

যদিও দেশটির সরকার জানিয়েছে, তাদের কাছে আরও অন্তত এক মাসের গ্যাস মজুত রয়েছে। তবু সংকটের আতঙ্কে অনেকেই জ্বালানি মজুত করে রাখার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত হয়ে মজুত করা বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।

ইরান বলছে, আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেই তারা পাল্টা হামলা এবং হরমুজ প্রণালি অবরোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৩০০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ব্যাপক সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। 

ইরানের কৌশলের প্রভাব এরই মধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে। গত রোববার বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ ব্যারেলপ্রতি ১২০ টাকায় পৌঁছায়। অবশ্য পরে তা কিছুটা কমে শেষ পর্যন্ত ১০০ ডলারে স্থির হয়। তবু যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এটি ৪০ ডলার বেশি।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) চলতি সপ্তাহে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক ফোঁটা তেলও পরিবহন করতে দেবে না তারা। একই সঙ্গে তারা সতর্কতা দিয়েছে, ক্রেতারা যেন ব্যারেলপ্রতি তেল ২০০ ডলারে কেনার জন্য প্রস্তুত থাকে। 

গত বুধবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) রেকর্ড ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেও জ্বালানির দাম স্থিতিশীল করতে তা খুব বেশি কার্যকর হয়নি।

এ পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি হর্ষ ভি পান্ত বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপক নির্ভরতার কারণে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। জ্বালানির বাজার এরই মধ্যে অস্থির হয়ে উঠেছে এবং দামও বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত এটি সামগ্রিক অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’

ভারতের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত ও বাহরাইন তথা গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে কর্মরত প্রায় ৯১ লাখ ভারতীয় নাগরিক। এই প্রবাসীরা প্রতি বছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স ভারতে পাঠান। 

হর্ষ ভি পান্ত বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে। এতে ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভারতের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার প্রত্যাশা বড় ধাক্কা খাবে। এটি শুধু জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও বিষয়।’

উপসাগরের বিভিন্ন দেশে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিক ও পেশাজীবীরা আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ আরও তীব্র হলে তারা চাকরি হারাতে পারেন। কেননা, ইরানের হামলার কারণে অনেক তেল ও গ্যাস কোম্পানি এরই মধ্যে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত ভারতীয় একজন নির্মাণশ্রমিক নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, ‘আমি আশা করি, যুদ্ধ দীর্ঘ হবে না। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে আমি চাকরি হারাব। আর এই চাকরির ওপরই আমার পরিবারের ভরণপোষণ নির্ভর করে।’

সৌদি আরবে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত তালমিজ আহমেদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত প্রত্যেক ভারতীয় ব্যক্তি তার পরিবারের অন্তত চার থেকে পাঁচজনের সদস্যের ভরণপোষণ করেন। সে হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত ভারতীয়দের আয়ে সরাসরি উপকৃত হন প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি মানুষ। 

এ ছাড়া যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানি হামলায় নিহতদের মধ্যে ভারতীয়সহ এশিয়ার কয়েকজন শ্রমিকও রয়েছেন। 

উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি প্রবাসী বাস করেন। তাদের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ভারতীয়—৯১ লাখ। সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে পাকিস্তান। মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানি আছেন প্রায় ৪৯ লাখ। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধ যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে ভারতকে তাদের বিপুল সংখ্যক নাগরিককে সরিয়ে নিতে হতে পারে। পশ্চিমা অনেক দেশের নাগরিক এরই মধ্যে নিজ নিজ সরকারের উদ্যোগে অঞ্চলটি ছেড়ে গেছেন বা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশাল সংখ্যার কারণে ভারতের জন্য এটি একটি বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত তালমিজ আহমেদ বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোনো দেশই এত সংখ্যক মানুষকে স্থানান্তর করতে পারবে না।’

উপসাগরীয় দেশে থাকা ভারতীয়দের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভালো সময়ে আমরা যেমন উপসাগরীয় ভাইদের পাশে ছিলাম, খারাপ সময়েও আমরা তাদের সঙ্গেই থাকব।’ 

তবে অতীতে ভারত সফলভাবে বড় আকারের উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে। যখন ১৯৯০ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাক যখন কুয়েত দখল করে নেয়, পরে ১৯৯১ সালের দেশটি থেকে প্রায় দুই লাখ ভারতীয়কে সরিয়ে নিয়েছিল দেশটি।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণের সময়ও সৌদি আরবে থাকা ভারতীয় দূতাবাস জরুরি ব্যবস্থা নিয়েছিল। সীমান্ত পার হয়ে কেউ এলে তাদের জন্য বাস, তাঁবু, কম্বল ও খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের হর্ষ ভি পান্ত বলেন, ‘যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ভারতের নির্ভরতা আগের মতোই থাকবে। তবে সংঘাত বাড়লে বিকল্প উৎস খুঁজতে হতে পারে। রাশিয়ার তেল একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।’

এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনায় এখনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি ভারত। যদিও নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসে গিয়ে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব। তবে সরকারের এই নীরবতার সমালোচনা করছে দেশটির বিরোধী দল কংগ্রেস। বরং উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার নিন্দা জানিয়েছে নয়াদিল্লি। 

কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী একটি পত্রিকায় লিখেছেন, ‘যখন বিদেশি কোনো নেতাকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমাদের দেশ সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেয় না, তখন সেটি আমাদের পররাষ্ট্রনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। এই ক্ষেত্রে নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়।’

এদিকে মার্কিন সাবমেরিনের হামলায় শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনায়ও ভারতের নীরবতা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। জাহাজটি ভারতের আয়োজিত সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়ার পর দেশে ফিরছিল। 

তবে পরে ভারত মহড়ায় অংশ নেওয়া আরেকটি ইরানি যুদ্ধজাহাজকে আশ্রয় দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। যুদ্ধ শুরুর পর এটাই তাদের প্রথম আলোচনা। 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার কয়েক দিন আগে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের অন্যতম বড় ক্রেতা। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে থাকা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছে। 

লেখক শ্রীনাথ রাঘবন একটি পত্রিকায় লিখেছেন, ‘ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত নেতা নেতানিয়াহু জানেন, তার রাজনৈতিক টিকে থাকা নির্ভর করছে দুই বিষয়ের ওপর—মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলমান রাখা এবং বিদেশি নেতাদের কাছ থেকে বৈধতা পাওয়া। এই ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রথমটি দিয়েছেন, আর মোদি দ্বিতীয়টি।’

তবে হর্ষ ভি পান্ত ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিকে সমর্থন করেছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরব দেশ ও ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এতটাই গভীর হয়েছে যে সেই মাত্রায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘ভারত বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের তুলনায় আরব বিশ্ব ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কই এখন ভারতের স্বার্থকে বেশি প্রভাবিত করছে।’

লেখক: আলজাজিরার সাংবাদিক

আলজাজিরার ‘এক্সপ্লেইনার’ বিভাগ থেকে অনূদিত।