মিত্রদের সহায়তার অভাবে যুদ্ধ পরিচালনার অর্থ ফুরিয়ে আসছে ইউক্রেনের

মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগামী দুই মাসের মধ্যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের খরচ মেটানোর অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ইউক্রেন। সূত্রের বরাতে ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, বর্তমানে কিয়েভের কাছে আগামী জুন পর্যন্ত যুদ্ধের খরচ চালানোর মতো তহবিল রয়েছে। তবে এরপর বাইরের সহযোগিতা না পেলে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অসুবিধায় পড়বে তারা।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ইউক্রেনের টিকে থাকার প্রধান শক্তিই ছিল পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থন। তবে বর্তমানে সেই কৌশলগত অবস্থানে ফাটল ধরেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৯০ বিলিয়ন ইউরোর ঋণে হাঙ্গেরির ভেটো, আইএমএফের সর্বশেষ সহায়তা প্যাকেজ নিয়ে বিতর্ক এবং ন্যাটোর অস্ত্র সহায়তায় স্থবিরতা গভীর সংকটে ফেলেছে কিয়েভকে।
ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আন্দ্রি পিশনি চলতি মার্চের শুরুতে ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, আন্তর্জাতিক তহবিল না এলে চরম সংকটের মুহূর্তে তার প্রতিষ্ঠান অর্থ মন্ত্রণালয়কে সরাসরি ঋণ দিতে বাধ্য হতে পারে। সে অর্থ দিয়ে সেনা ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন এবং জরুরি সেবা খাত সচল রাখা হবে।
ইউক্রেনের এই আর্থিক সংকট এমন এক সময়ে দেখা দিল, যখন ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম রাশিয়ার রাজকোষ সমৃদ্ধ করছে। মস্কো যখন এই বাড়তি মুনাফায় যুদ্ধের রসদ জোগাচ্ছে, কিয়েভের জন্য তখন প্রতিরক্ষা ব্যয় মেটানোই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত মার্কিন সামরিক সামর্থ্য এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোযোগকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছে। ফলে ইউক্রেন সংকটের কূটনৈতিক সমাধান ও শান্তিচুক্তির উদ্যোগগুলোও আড়ালে পড়ে গেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সরাসরি সহায়তা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে কিয়েভকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও অর্থ জোগানোর পুরো দায়ভার এখন কার্যত ইউরোপের কাঁধেই চেপেছে।
হাঙ্গেরির বাধা ও রাজনৈতিক জটিলতা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন তহবিল এপ্রিলের শুরুতেই পাওয়ার কথা ছিল ইউক্রেনের। কিন্তু হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান এতে বাধা দিয়েছেন। তিনি শর্ত দিয়েছেন, ইউক্রেনকে দ্রুজবা পাইপলাইন দিয়ে রুশ তেলের সরবরাহ পুনরায় চালু করতে হবে। অন্যথায় তিনি এই ঋণ প্রস্তাবে ভেটো দেওয়া অব্যাহত রাখবেন।
যদিও দ্রুতই এই অর্থ হাতে পাওয়ার আশা করছে ইউক্রেন, তবে অন্তত আগামী ১২ এপ্রিল হাঙ্গেরির নির্বাচনের আগে এই ঋণের ফয়সালা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি হাঙ্গেরির এই কৌশলকে বলেছেন ব্ল্যাকমেইল। সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি স্বীকার করেছেন, এ অর্থ না পেলে ইউক্রেনের ড্রোন উৎপাদন ব্যাহত হবে। একই সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনাও কঠিন হয়ে পড়বে, যা যুদ্ধের জন্য খুবই জরুরি।
অন্যান্য আর্থিক চ্যালেঞ্জ
ইউক্রেন সরকার ও পার্লামেন্টের রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে আইএমএফের ৮১০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে কিয়েভ। এ বিষয়টি ইউক্রেনের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
এছাড়া কিছু ন্যাটো মিত্র দেশ মার্কিন অস্ত্র কেনার জন্য ইউক্রেনকে নতুন করে অর্থ দিতে অনিচ্ছুক। অথচ ইউক্রেনের অনুমান অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালে অস্ত্র কেনার জন্যই তাদের এক হাজার ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন।
ইউক্রেনের আর্থিক কর্তৃপক্ষের মতে, চলতি বছর তাদের পাঁচ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন। পার্লামেন্টারি ফিন্যান্স কমিটির প্রধান দানিলো হেটমানৎসেভ বলেছেন, ‘বর্তমান অর্থ সংকট অব্যাহত থাকলে এপ্রিলের মধ্যেই ইউক্রেন এক আর্থিক ট্র্যাজেডির সম্মুখীন হতে পারে।’