দুই মাসের যুদ্ধে কতটা বদলেছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলার দুই মাস পর ইরান ও দেশটির ৯ কোটির বেশি মানুষের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সাধারণ মানুষ চাকরি হারানো ও নিত্যপণ্যের সংকটে ভুগছে। তবে রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতাকেন্দ্র এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই আগের মতোই থেকে গেছে, বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হয়েছে।
যুদ্ধ এখনও শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়নি, পাশাপাশি এর ভবিষ্যৎও স্পষ্ট নয়। তবে এখন পর্যন্ত যা ঘটেছে, তা ভবিষ্যতে কী হতে পারে তার কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নেতৃত্বে পরিবর্তন ও ক্ষমতার ধারাবাহিকতা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেছে। কারণ, শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নামও উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে বাস্তবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও কার্যকর রয়েছে। এমনকি ক্ষমতাসীন ধর্মীয় পরিষদের মাধ্যমে দ্রুতই খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নির্বাচিত করা হয়েছে।
সামরিক, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ সবাই নতুন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। যদিও নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায়নি এবং তার বক্তব্য মূলত লিখিত আকারে প্রচারিত হচ্ছে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখনও দেশের সামরিক ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে কাজ করছে। একইসঙ্গে এটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করছে, বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।
কঠোর অবস্থানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো
নিরাপত্তা পরিষদ, বিচার বিভাগ এবং পার্লামেন্ট, সব ক্ষেত্রেই কঠোরপন্থি বা হার্ডলাইন নেতৃত্বের প্রভাব বজায় রয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও মিডিয়া সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ভিডিওসহ নানা মাধ্যমে সরকারপন্থি বার্তা প্রচার করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের নির্বাচনে তুলনামূলক মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রেসিডেন্ট হলেও, তার ক্ষমতা মূলত অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে সীমাবদ্ধ। বড় নীতি নির্ধারণে তার ভূমিকা সীমিত।
রাজনৈতিক বিভাজন ও আঞ্চলিক অবস্থান
ইরান এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বড় ধরনের আপস করতে রাজি হয়নি। হার্ডলাইন নেতারা মনে করেন, এমন কোনো ছাড় দেওয়া মানে হবে আত্মসমর্পণ।
সরকার দাবি করছে, তাদের সামরিক শক্তি এখনও প্রস্তুত, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল আরও হামলা চালালে তারা পাল্টা আক্রমণ চালাতে সক্ষম।
পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ তুলনামূলক বাস্তববাদী অবস্থান থেকে আলোচনার মাধ্যমে কিছু সমাধানের ইঙ্গিত দিলেও তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আত্মসমর্পণ হবে না।’
ইরান এখন পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও পশ্চিমা দেশগুলো এবং ইসরায়েল এই ইস্যুকেই যুদ্ধের মূল কারণ হিসেবে দেখছে।
অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ সংকট
যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি গুরুতর সংকটে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত শিল্প অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেশটিকে চাপের মধ্যে রেখেছে।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে বা আয় বন্ধ হয়ে গেছে। নিরাপত্তার কারণে এই বিধিনিষেধ এখন ৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলছে।
অন্যদিকে, সরকার এখন খাদ্য ও ওষুধ আমদানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে।
কঠোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি
গ্রেপ্তার, বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে, যেখানে মানুষকে গুপ্তচরবৃত্তি বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দেখানো হচ্ছে।
রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে সামরিক উপস্থিতিও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সশস্ত্র টহল, চেকপোস্ট এবং ভারী অস্ত্রধারী বাহিনীর উপস্থিতি এখন দৈনন্দিন দৃশ্য হয়ে উঠেছে। সার্বিকভাবে, ইরানে যুদ্ধ কিছু পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল কাঠামো এখনো অটুট রয়েছে—বরং আরও কঠোর ও কেন্দ্রীভূত হয়ে উঠেছে।
সূত্র: আলজাজিরা