ইরান যুদ্ধে রাশিয়া কেন নিরপেক্ষ থাকবে

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আক্রমণ এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়তুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড রাশিয়াকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছে। কিছু উগ্র রাশিয়ান ভাষ্যকার দাবি করেছেন, রাশিয়ার বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রাগার থাকা সত্ত্বেও একইভাবে আক্রমণের শিকার হতে পারে। ভবিষ্যতে রাশিয়ার সঙ্গেও পশ্চিমাদের যুদ্ধ হতে পারে। কারণ, রুশদের সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়ে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলো প্রায়ই বেপরোয়া বক্তব্য দিচ্ছে।
ইরানের ওপর পশ্চিমাদের আক্রমণে রাশিয়া উদ্বিগ্ন। তবুও এ হামলার বিষয়টিকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ আগ্রাসনসহ রাশিয়ার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের যথার্থতা প্রমাণে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। এছাড়া পশ্চিমারা যে দুর্বৃত্ত সে বিষয়টিও উদাহরণসহ প্রমাণ করতে পারে রুশ সরকার।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ মূলত ২০১১ সালে লিবিয়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিধ্বনি। ওই সময় ন্যাটো-নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে লিবিয়ান নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং দেশটি খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। এরপর লিবিয়া আর অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারেনি। এ ঘটনা পুতিনকে পশ্চিমা হুমকির বিষয়ে সতর্ক করেছিল।
এখন মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানে পশ্চিমা আগ্রাসন দেখে পুতিন সম্ভবত ইউক্রেনে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে ন্যায্য বলে মনে করছেন। একইসঙ্গে তিনি সোভিয়েত পূর্বসূরিদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ, ওই সময় দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রাগার তৈরি করে। এসব পরমাণু অস্ত্রই মূলত রাশিয়াকে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সহায়তা করছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান রাশিয়াকে ড্রোন সহায়তা করলেও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অচলাবস্থায় রুশ কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ রয়েছে। কারণ, দেশটি এখন নিজেও ব্যয়বহুল একটি যুদ্ধে নিয়োজিত। এছাড়া রাশিয়ার ইসরায়েলের সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক আক্রমণবিরোধী চুক্তি রয়েছে। এ কারণে ইরানের বিরুদ্ধে চলা সংঘাতে রুশরা হস্তক্ষেপ করতে চায় না। অপরদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব অবস্থান মূলত নিরপেক্ষ। আলোচনার টেবিলে এ যুদ্ধ সমাপ্ত করতে চান তিনি। এ কারণে মস্কো ট্রাম্প প্রশাসনকে বিনা কারণে খেপাতে চায় না।
এ বিষয়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান স্বল্পমেয়াদে রাশিয়ার জন্য লাভজনক। এ যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে রাশিয়া জ্বালানি বিক্রয়ের খাত থেকে আগের চেয়েও বেশি রাজস্ব লাভ করতে পারবে। এছাড়া জ্বালানি মূল্য বেশি হওয়ায় এ প্রভাব পড়বে ইউরোপে। এর ফলে ইউক্রেনের সরকারকে যুদ্ধ করার জন্য অর্থ বরদ্দ দিতে পারবে না ইউরোপীয় দেশগুলো।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মার্কিন অস্ত্রাগারের ভাণ্ডারও হ্রাস করবে। এর ফলে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে যাবে। কারণ, দেশটি মূলত পশ্চিমাদের থেকেই অস্ত্র ও অর্থ পায়। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটকে পড়ার অর্থ হলো ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান আলোচনায় মস্কো আরও বেশি সুবিধা পেতে পারে।
এছাড়া পুতিন ইরানের ধ্বংস এবং বিশৃঙ্খলার দৃশ্য থেকেও উপকৃত হবেন। কারণ, এর ফলে রুশরা আরও বেশি করে পুতিননির্ভর হয়ে উঠবে। পাশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা পুতিনকে জাতির রক্ষক ভাবা শুরু করবে।