দুইয়ের অধিক সন্তান নিলেই টাকা দেবে ভারতের এক রাজ্য

জনসংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে আর্থিক প্রণোদনার উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্য সরকার। ঘোষিত এই প্রকল্পের আওতায় দুইয়ের অধিক সন্তান নিয়ে আর্থিক সহায়তা পাবেন বাবা-মা। তৃতীয় সন্তানের জন্য ৩০ হাজার টাকা (ভারতীয় মুদ্রায় রুপি) এবং চতুর্থ সন্তানের জন্য দেওয়া হবে ৪০ হাজার টাকা।
শনিবার (১৬ মে) অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু শ্রীকাকুলাম জেলার তাম্রপল্লি গ্রামে এক জনসভায় এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, সরকার নতুন জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা নীতির অংশ হিসেবে বড় পরিবারকে উৎসাহিত করতে চায়। শিশুরাই আমাদের সম্পদ। এই বার্তাটিই আমি রাজ্যজুড়ে পৌঁছে দিতে চাই।
রাজ্য সরকারের এই নতুন পদক্ষেপটি গত মার্চে বিধানসভায় উপস্থাপিত ‘জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা নীতি’র খসড়ার চেয়ে আরও বড় পরিসরের। ওই খসড়ায় মূলত দ্বিতীয় সন্তান নিতে আগ্রহী দম্পতিদের ২৫ হাজার টাকা নগদ প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।
চন্দ্রবাবু নাইডু ১৯৯০-এর দশকে ক্ষমতায় থাকাকালে কঠোর পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নীতির সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে এখন তিনি স্বীকার করেছেন, বিশ্ব ও দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে আগের অবস্থান থেকে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘একটা সময় ছিল যখন আমি পরিবার পরিকল্পনার জন্য ব্যাপকভাবে কাজ করেছি। কিন্তু আজ শিশুরা আমাদের সম্পদ। আবারও আমাদের সবাইকে শিশুদের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আমি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তা হলো তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে জন্মের পরপরই আমরা ৩০ হাজার টাকা দেব এবং চতুর্থ সন্তানের ক্ষেত্রে দেব ৪০ হাজার টাকা।
কেন এই সিদ্ধান্ত
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের এই পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হ্রাসমান জন্মহার এবং ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রাজ্য সরকার ‘জনসংখ্যার যত্ন’-এর ওপর মনোযোগ দিচ্ছে।
গত ৫ মার্চ বিধানসভায় জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা নীতির খসড়া পেশ করার সময় তিনি বলেছিলেন, বিগত দশকগুলোতে রাজ্যের মোট প্রজনন হার (টিএফআর) তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে। তার মতে, রাজ্যের টিএফআর বর্তমানে ১ দশমিক ৫, যা ১৯৯৩ সালে ছিল ৩ দশমিক শূন্য। জনতাত্ত্বিক ভারসাম্য বজায় রাখতে আদর্শ প্রজনন হার ২ দশমিক ১ হওয়া উচিত।
রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাইডু বলেন, যদি টিএফআর ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকে, তাহলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। আর এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে দিতে পারে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালির মতো দেশগুলোতে দেখা জনসংখ্যাগত চ্যালেঞ্জের অনুরূপ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে অন্ধ্রপ্রদেশ। দেশগুলোতে বয়স্ক জনসংখ্যা ও কম জন্মহার প্রধান অর্থনৈতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বয়স্ক জনসংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ
২০২৩ সালের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী নাইডু বলেন, সে বছর অন্ধ্রপ্রদেশে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪৭ সালের মধ্যে রাজ্যের প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষ প্রবীণ হয়ে যেতে পারেন। এই ধরনের পরিবর্তন ভবিষ্যতে অর্থনীতি ও জনকল্যাণ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যে পরিবারের আকার সংক্রান্ত প্রবণতার তথ্যও তুলে ধরেছেন। তার মতে, প্রায় ৩ লাখ পরিবারে (মোট পরিবারের ৫৮ শতাংশ) বর্তমানে একটিমাত্র সন্তান রয়েছে। অপরদিকে প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার পরিবারে দুই বা ততোধিক সন্তান রয়েছে।
ফাইভ-পিলার পলিসি
নাইডু বলেছেন, প্রস্তাবিত নীতিটি জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার জন্য ফাইভ-পিলার পলিসি অনুসরণ করবে। কাঠামোটির মধ্যে রয়েছে মাতৃত্ব, ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য, দক্ষতা ও স্বাস্থ্য যত্ন।
জনসংখ্যা নীতিকে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে নারী শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার বর্তমানে ৩১ শতাংশ। এটি বেড়ে ৫৯ শতাংশ হলে অন্ধ্রপ্রদেশের মোট রাজ্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
আরও যেসব সুবিধা থাকছে
প্রস্তাবিত নীতিমালায় সন্তান জন্মদানে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে একাধিক সুবিধা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নাইডু বলেছেন, এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই বা ততোধিক সন্তানের বাবা-মায়েরা সন্তান প্রসবের সময় ২৫ হাজার টাকা পাবেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করার জন্য এই পদক্ষেপটি একটি বড় নীতিগত হস্তক্ষেপ হবে।
এককালীন প্রণোদনা ছাড়াও সরকার তৃতীয় সন্তানের জন্য পাঁচ বছর ধরে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা পুষ্টি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করছে। এই নীতিমালায় শিশুটির ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
রাজ্য সরকার তৃতীয় সন্তানের পরিবারগুলোর জন্য পিতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করছে। এর মধ্যে বাবাদের জন্য ১২ মাসের ছুটি ও দুই মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

