আরাঘচির রাশিয়া সফর যুক্তরাষ্ট্রকে কী বার্তা দিচ্ছে

সংকট নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে দৌড়ের ওপর রয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিন দিনের ব্যবধানে দুবার পাকিস্তান ও ওমান সফরের পর সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাশিয়ার পিটার্সবার্গে পৌঁছেছেন তিনি। সেখানে সরাসরি মস্কোতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে তার।
এই সফরের মাধ্যমে তেহরান কী শুধু নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে নাকি দীর্ঘদিনের ‘শত্রু’ যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী কোনো বার্তা দিতে চাইছে তাই এখন দেখার বিষয়।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকার সঙ্গে সম্ভাব্য যে কোনো আলোচনার আগে ইরান তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে রণকৌশল ঝালিয়ে নিতে চাইছে। সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছে আরাঘচি বলেছেন, পুতিনের সঙ্গে বৈঠক যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় তেহরান ও মস্কোর পারস্পরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমকে আরাঘচি বলেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তেহরান ও মস্কোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ পরামর্শ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে রাশিয়া সফর করছেন তিনি। রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার বৈঠকটি যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা এবং সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনার একটি ভালো সুযোগ হবে।
সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি। ইরান শুরু থেকেই সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং কোনো ধরনের অর্থনৈতিক বা সামরিক অবরোধের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। রাশিয়াও এই ইস্যুতে ইরানকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ভিয়েনায় রুশ প্রতিনিধি মিখাইল উলিয়ানভ ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেছেন, ভয় দেখিয়ে বা আল্টিমেটাম দিয়ে ইরানের কাছ থেকে কোনো সুবিধা আদায় করা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে এবং যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে শর্ত দিয়েছে ইরান। তবে এই প্রস্তাবে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে তেহরান। তারা যুদ্ধের সমাপ্তি ও অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানালেও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ‘পারমাণবিক আলোচনা’ আপাতত তুলে রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।
ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে আরাঘচি রাশিয়া সফরে গেছেন। রোববার (২৬ এপ্রিল) তিনি ইসলামাবাদে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। এর আগে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক আল সাইদের সঙ্গেও নিরাপত্তা ইস্যুতে কথা বলেন তিনি।
গত ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রথম দফার আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। উভয়পক্ষের প্রস্তাবে সমঝোতা না আসায় দ্বিতীয় দফার বৈঠকও ঝুলে আছে। পাকিস্তানে গত শুক্রবার থেকে রোববারের মধ্যে ইরান একাধিকবার সফর করলেও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রতিনিধিদল পাঠানো স্থগিত করে রেখেছে। তবে এই দফার আলোচনার আগে রাশিয়ায় আরাঘচির সফর নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। ধরণা করা হচ্ছে, মস্কোকে পাশে পাওয়া ইরানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
আরাঘচির এই মস্কো সফরের বার্তাটি পরিষ্কার—ইরান আলোচনার জন্য প্রস্তুত হলেও তারা একা নয়। রাশিয়ার মতো শক্তিশালী মিত্রের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান থেকে আমেরিকার মুখোমুখি হতে চায়। হয়তো আগামী ২৪ ঘণ্টার যে কোনো সময়ে পুতিন ও আরাঘচির বৈঠক এ যুদ্ধের মোড় অন্যদেকও ঘুরিয়ে দিতে পারে।
কেমন ছিল ওমান ও পাকিস্তান সফর
সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছানোর পর সংবাদমাধ্যমের কাছে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তান ও ওমান সফর নিয়েও আলোচনা করেছেন। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে তিনি জানান, তার ইসলামাবাদ সফর ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ। উভয় সফরে তাদের মধ্যে ভালো পরামর্শ বিনিময় হয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তারা অতীতের ঘটনাবলি এবং ঠিক কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখা যেতে পারে— সেসব বিষয়ে পর্যালোচনা করেছেন।
ওমান সফর নিয়ে আরাঘচি জানান, হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। ইরান ও ওমান হলো হরমুজ প্রণালির দুই উপকূলীয় রাষ্ট্র, তাই পারস্পরিক পরামর্শ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে বর্তমানে এই প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত যখন গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে তখন এই আলোচনার গুরুত্বও বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই প্রণালির দুই উপকূলীয় দেশ হিসেবে এটি স্বাভাবিক যে, সাধারণ স্বার্থ নিশ্চিত করতে এবং যে কোনো পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সমন্বয় বজায় রাখতে আমাদের সংলাপে বসতে হবে। কারণ এখানে ইরান ও ওমান উভয়ের স্বার্থ সরাসরি জড়িত।
আরাঘচি জানান, ইরান ও ওমানের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের ঐকমত্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে এই পরামর্শ বা আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা