যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বিমান বিধ্বস্ত, আরোহী সবাই নিহত

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচ কাউন্টিতে নয়জন আরোহী নিয়ে একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। এতে উড়োজাহাজে থাকা নয়জনই নিহত হয়েছেন।
স্থানীয় সময় রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। উড়োজাহাজটিতে কতজন যাত্রী ও কতজন ক্রু ছিলেন, তা-ও জানানো হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি দুর্ঘটনায় প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করে একে ভয়াবহ ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন।
ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস বলেন, উড়োজাহাজটি ক্ষেপণাস্ত্রের মতো নিচে আছড়ে পড়তে দেখেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের (এনটিএসবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশটিতে এটি দ্বিতীয় প্রাণঘাতী উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা। এর আগে গত জুনে মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের বাটলারে স্কাইডাইভিংয়ের কাজে ব্যবহৃত একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ১২ জন নিহত হন।
ফ্লাইট সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, লিয়ারজেট-৬০ মডেলের উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। ২০০৮ সালে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার কলাম্বিয়া থেকে উড্ডয়নের সময় একই মডেলের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে চারজন নিহত হয়েছিলেন।
দুর্ঘটনার আগে পাইলটের জরুরি বার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) তথ্য অনুযায়ী, লিয়ারজেট-৬০ মডেলের উড়োজাহাজটি টেক্সাসের অস্টিন-বার্গস্ট্রম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাহামাসের উদ্দেশে যাচ্ছিল।
বিমান নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে পাইলটের কথোপকথনের রেকর্ডে দুর্ঘটনার আগে উড়োজাহাজটিতে বরফ জমার তথ্য পাওয়া গেছে। লাইভএটিসি ডটনেটের প্রকাশিত ওই অডিওতে পাইলটকে বলতে শোনা যায়, উড়োজাহাজটিতে বরফ জমছে এবং মাঝারি মাত্রার ঝাঁকুনির কারণে এটি প্রায় ৭০০ ফুট পর্যন্ত ওঠানামা করছে। তখন বাইরের তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
পাইলট জানান, উড়োজাহাজটিতে হালকা ও স্বচ্ছ বরফ জমলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে কিছুক্ষণ পর বৃষ্টিপাত শুরু হলে তিনি উড়োজাহাজটির উচ্চতা বাড়ানোর অনুরোধ জানান। এর পরপরই জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেন।
অডিও রেকর্ডে পাইলটকে বলতে শোনা যায়, উড়োজাহাজটি দ্রুত নিচে নামছে। একপর্যায়ে তিনি ‘মে ডে’ ঘোষণা করে জানান, প্রতি মিনিটে ১০ হাজার ফুট গতিতে নিচে নামছে উড়োজাহাজটি। পরে সেই গতি বেড়ে ২০ হাজার ফুটে পৌঁছানোর কথা জানান তিনি। শেষ মুহূর্তে পাইলট বলেন, ‘আমরা মাটিতে আছড়ে পড়তে যাচ্ছি।’
বিমান চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী ওয়েবসাইট এডিএস-বি এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাইটের তথ্য পাওয়া বন্ধ হওয়ার ঠিক আগে মাত্র এক মিনিটে উড়োজাহাজটি প্রায় ২৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়।
দুর্ঘটনাস্থলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
পাম বিচ কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, মিলিটারি ট্রেইল এলাকায় ক্রেস্টহেভেন বুলেভার্ড ও টেনথ অ্যাভিনিউ নর্থের মাঝামাঝি স্থানে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়।
দুর্ঘটনায় মাটিতে থাকা কেউ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে উড়োজাহাজটি আছড়ে পড়ার স্থানে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে এবং আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনার কারণে একটি সড়কের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৬০০ মানুষ আশ্রয়সংকটে পড়েছেন।
পাম বিচ কাউন্টির কমিশনার জোয়েল ফ্লোরেস জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের কাউন্টির দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে। দুর্ঘটনাস্থল তদন্তের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা বাড়িতে ফিরতে পারবেন না।
প্রত্যক্ষদর্শী অ্যান্ড্রু মানিনো জানান, তিনি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন এবং ভূমিকম্পের মতো অনুভব করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর আকাশে বড় কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখতে পান তিনি।
তদন্তে এফএএ ও এনটিএসবি
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করবে এফএএ ও এনটিএসবি। এনটিএসবির তদন্তকারীদের দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সোমবার এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সিএনএনের বিমান চলাচলবিষয়ক বিশ্লেষক এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন বিভাগের সাবেক মহাপরিদর্শক মেরি শিয়াভো বলেন, দুর্ঘটনার আগের ড্যাশক্যাম ভিডিও তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তার মতে, উড়োজাহাজটির অস্বাভাবিক দ্রুত অবতরণ নিয়ন্ত্রণ হারানোর ইঙ্গিত দেয়।
তিনি আরও বলেন, উড়োজাহাজের পাখা ও অন্যান্য অংশে বরফ জমলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে পাইলট উড়োজাহাজের গতিপথ ও গতি নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়তে পারেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় এনটিএসবিও উড়োজাহাজে বরফ জমার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। সংস্থাটি জানিয়েছিল, এ ধরনের পরিস্থিতিতে উড়োজাহাজের উচ্চতা ও গতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যেতে পারে।
দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকায় ঝড়বৃষ্টিও হচ্ছিল। উড়োজাহাজটি নিচে নামতে শুরু করার কয়েক মিনিট আগে একটি শক্তিশালী ঝোড়ো মেঘের মধ্য দিয়ে যায়। তবে আবহাওয়া দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে দুর্ঘটনার কারণে মিলিটারি ট্রেইলের উত্তর ও দক্ষিণমুখী সব লেন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। চালকদের ওই এলাকা এড়িয়ে বিকল্প সড়ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
উল্লেখ্য, দুর্ঘটনাস্থলটি ওয়েস্ট পাম বিচের ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় চার মাইল দক্ষিণে। রোববার দুর্ঘটনার এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিমানবন্দর থেকে এয়ারফোর্স ওয়ানে করে অন্যত্র রওনা হন।




