যুদ্ধের মাঝে যেভাবে দিন কাটছে ইরানের জনগণের

‘যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে, তাই পরিস্থিতি খুব খারাপ হলেই আমি এবং আমার পরিবার চলে যাব। আপাতত জীবন চলতেই থাকবে’— আল জাজিরাকে এমনটা বলছিলেন পূর্ব তেহরানের বাসিন্দা সেপেহর।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণের পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ প্রায় ৪০ জন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এরপর প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও দূতাবাসে এবং ইসরাসেলের তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে হামলা চালিয়ে শক্তির জানান দিয়ে যাচ্ছে ইরান।
অন্যদিকে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। প্রবল বোমাবর্ষণ হওয়া সত্ত্বেও কোনোভাবে স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন ইরানের সাধারণ মানুষ। একই সময় দেশজুড়ে বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগও কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার সময় নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কিছু পানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ বা পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার মতো বড় ধরনের ঘটনা ঘটেনি। তারা জনগণকে পানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনি আল জাজিরাকে বলেন, তিনি যেখানে থাকেন, সেখানে এই সপ্তাহে বিস্ফোরণের তীব্র শব্দ নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, মাঝে মাঝে ঘন ধোঁয়া দিগন্তে উড়ে যায় এবং জানালা কাঁপিয়ে দেয়।
প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার বসবাস তেহরানে। গত শনিবার সকালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন ও ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে এখন পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু পানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় আকারে বিদ্যুৎ বা পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
রাজধানীর রাস্তাঘাট স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ফাঁকা, যানজটও কম। অনেক দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। তবে মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দোকান থেকে সরাসরি বা অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে।
পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি পাড়ায় বসবাসকারী মারজান বলেন, যখন মনে হচ্ছে যে বোমা হামলা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ আছে, তখন আমি স্থানীয় দোকান থেকে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে দিনে একবার যাই। সাধারণত রুটির জন্য মানুষের লাইন থাকে, যা খুব বেশি দীর্ঘ হয় না। এ ছাড়া কিছু পেট্রোল স্টেশনেও লাইন দেখা যায়।
তিনি বলছেন, কিছু জিনিসপত্রের সরবরাহ ঘাটতি আছে। তা বাদ দিলে দোকানগুলোতে আপাতত প্রয়োজন সবই পাওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতে কী হবে কে জানে। কিন্তু এখন পণ্যের দাম মানুষের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ শুরুর দুই দিন আগে ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র (এসসিআই) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক পৃথক দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেখানে দেখা যায়, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে ৯ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।
এসসিআই আরও জানায়, ইরানি ক্যালেন্ডারের বাহমান মাসে (১৯ ফেব্রুয়ারি যা শেষ হয়েছে) বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৮ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই সময়ের মূল্যস্ফীতি উল্লেখ করেছে ৬২ দশমিক ২ শতাংশ।
খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির দিক থেকেও ইরান এখন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষে। গত মাসের শেষে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০৫ শতাংশ। এর মধ্যে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ২০৭ শতাংশ, মাংস ১১৭ শতাংশ, ডিম ও দুগ্ধজাত পণ্য ১০৮ শতাংশ, ফল ১১৩ শতাংশ এবং রুটি ও ভুট্টার দাম বেড়েছে ১৪২ শতাংশ।
ইরানের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ গত বুধবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে সরকারের কিছু উদ্বেগ ছিল। তবে সৌভাগ্যবশত পরিস্থিতি এখন ভালো আছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের ওষুধের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বেশির ভাগ ওষুধের দাম বেড়েছে এবং কিছু ওষুধের (যেমন: বিষণ্নতা প্রতিরোধী ওষুধ) তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে সংকটে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাজারে শুধু দেশীয় উৎপাদিত ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। বিদেশি ওষুধ একেবারেই মিলছে না।
সরকার এখনো মানুষের জন্য ন্যূনতম নগদ ভর্তুকি দিচ্ছে, যাতে তারা প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারে। সম্প্রতি এই ভর্তুকি কর্মসূচিতে কেনা যায়, এমন পণ্যের তালিকায় শিশুদের ডায়াপারও যোগ করা হয়েছে, যার দাম গত কয়েক মাসে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধপরিস্থিতি তৈরি হলে যাতে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ চালু রাখা যায়, সে জন্য প্রাদেশিক গভর্নর ও মন্ত্রীদের কোনো রকম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়া বেশি পরিমাণে জরুরি পণ্য আমদানির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
দশকের পর দশক দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতবিক্ষত ইরানি অর্থনীতি আবারও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এখন আবার দেশটি ইরানের অঞ্চলজুড়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে চলতি বছর ইরানি মুদ্রার দর ছিল প্রতি মার্কিন ডলারে প্রায় ১৬ লাখ ৬০ হাজার রিয়াল, যা প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় দেশটির শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা গেছে। তবে স্বর্ণের মতো ধাতুর দাম বেড়েছে।
‘অরওয়েলীয়’ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে রেখেছে ইরানের কর্তৃপক্ষ। এতে মানুষ মূলত রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও সরকারি বার্তা সেবার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। এসব মাধ্যমেই সরকারি বিবৃতি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বিভিন্ন সফল হামলার খবর প্রচার করা হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় বেসামরিক এলাকায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেসব খবরই বেশি প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু বহু পুলিশ স্টেশন বা আধাসামরিক ঘাঁটিতে হামলার যে প্রভাব, তা নিয়ে আলোচনা প্রায় নেই।
সাংবাদিক মিলাদ আলাভি বুধবার এক্সে লিখেছেন, ‘৫৯টির বেশি ভিপিএন ও প্রক্সি কনফিগারেশনে চেষ্টা করে ছয় ঘণ্টা পর এই টুইটটি পাঠাতে পেরেছি।’
তিনি বলেন, ‘ইরানে স্থায়ী ও মোবাইল দুই ধরনের ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন। আমরা কোনো খবর পাচ্ছি না, অথচ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে ইরান যেন তেল আবিব আর ওয়াশিংটন দখলের দ্বারপ্রান্তে!’
ক্লাউডফ্লেয়ার ও নেটব্লকসের মতো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, গত শনিবার সকালে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে যুদ্ধবিমান বোমা হামলা চালানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ তীব্রভাবে কমে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইন্টারনেট সংযোগ আগের তুলনায় ১ শতাংশের কমে নেমে আসে এবং এখনো সেই অবস্থায় রয়েছে।

বৃহস্পতিবার নেটব্লকস জানায়, ক্রমেই অরওয়েলীয় এক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। কারণ যারা বৈশ্বিক ইন্টারনেটে সংযোগের চেষ্টা করছে, টেলিকম কোম্পানিগুলো তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। অনেক ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, ভিপিএন ব্যবহারের চেষ্টা বা তা শেয়ার করার পর তারা টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের হুমকিমূলক বার্তা পেয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রিত একটি অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক চালু থাকায় স্থানীয় ওয়েবসাইট ও সেবাগুলো সীমিতভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে। ফলে কয়েকটি বড় সংবাদ ওয়েবসাইটের মন্তব্য বিভাগই এখন অনেক ইরানির জন্য অনলাইনে মতপ্রকাশের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু সেখানে সরকারের সমালোচনা বাড়তে থাকায় বিচার বিভাগ প্রযুক্তিবিষয়ক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট জুমিটের মন্তব্য বিভাগ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নাগরিকদের বারবার আহ্বান জানিয়ে বলছে, কোনো ধরনের সন্দেহজনক কার্যকলাপ বা মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান দেখলে যেন তারা নিরাপত্তা বাহিনীকে অবগত করে।
গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং চলতি বছরের জানুয়ারির দেশব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় ২০ দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এবারও বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগের জন্য কালোবাজার তৈরি হয়েছে।
এমন দুজনের সঙ্গে কথা বলেছে আল জাজিরা। তারা জানিয়েছেন, তারা ইরানের ভেতরে বিক্রেতাদের কাছ থেকে কয়েক গিগাবাইট সীমাবদ্ধ প্রক্সি সংযোগ কিনতে পেরেছেন। এসব সংযোগ খুব ধীরগতির এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। নিরাপত্তার কারণে তারা বিস্তারিত কিছু বলেননি।
এদিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইরানের জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে ভবিষ্যতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার কথা বলছেন। তবে ইরানের কর্তৃপক্ষ এখনো ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা কবে তুলে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো ঘোষণা দেয়নি।
আল জাজিরা থেকে অনূদিত