logo

হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিভ্রান্তি, জাহাজ চলাচল সত্যিই বন্ধ?

হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিভ্রান্তি, জাহাজ চলাচল সত্যিই বন্ধ?

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ৩০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনও স্পষ্ট নয় যে, সংকীর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করছে কি না। এর নিয়ন্ত্রণ আসলে কার কাছে-এ নিয়েও ছড়িয়েছে বিভ্রান্তিকর তথ্য। যুদ্ধের কারণে এই অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর ধাক্কা লেগেছে বেশ জোরেশোরেই।

বৈশ্বিক জাহাজ-ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলারের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি ‍চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে কোনো তেল বা গ্যাস ট্যাংকার প্রণালিটি অতিক্রম করেনি। তবে চারটি বাল্ক ক্যারিয়ার অর্থাৎ শুষ্ক পণ্যবাহী জাহাজ পার হতে পেরেছে।

স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রণালিটি ‘সম্পূর্ণরূপে বন্ধ’ করে দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি ট্যাংকারকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আধা-সরকারি গণমাধ্যমগুলো খবর দেয় যে, লেবাননের ওপর ইসরায়েলি হামলার জবাবে এবার প্রণালিটিতে যান চলাচল পুনরায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ওই প্রতিবেদনগুলোর পর থেকে কোনো জাহাজকে প্রণালিটি অতিক্রম করতে দেখা যায়নি। জলপথটি অতিক্রমকারী সর্বশেষ পণ্যবাহী জাহাজটি বুধবার পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল পৌনে ১১টার দিকে প্রণালিটির মাঝখানে শনাক্ত করা হয়েছিল।

কেপলারের মিডিয়া রিলেশনস ম্যানেজার নিকোস পোথিটাকিস নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, জাহাজা চলাচল এটাই প্রমাণ করে যে প্রণালিটির আনুষ্ঠানিক অবস্থা যাই হোক না কেন, এটি ‘কার্যত বন্ধই’ ছিল। কেন সীমিত যান চলাচল লক্ষ্য করা হচ্ছিল, তা স্পষ্ট ছিল না।

ইরানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, মাইনের কারণে জলপথটি পারাপারের জন্য জাহাজগুলোকে অবশ্যই ইরানি নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে নির্ধারিত পথ ব্যবহার করতে হবে। মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় ও ‘প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা’ বিবেচনায় রাখলে প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত সম্ভব হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন মত

হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তা অসত্য। এরপর তিনি ‘অবিলম্বে’ প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান। বর্তমানে জলপথটি কে নিয়ন্ত্রণ করছে, সে বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করা হলেও মার্কিন এই প্রতিনিধি কোনো উত্তর দেননি।

ক্যারোলাইন লেভিট সাংবাদিকদের আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার বিষয়ে ‘অগ্রহণযোগ্য’ মিথ্যা প্রতিবেদনগুলোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবগত আছেন। তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে আশ্বাস পেয়েছেন, প্রণালিটি আসলে ‘খোলা আছে’।

বাণিজ্যিক জাহাজবিষয়ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এসএসওয়াই বিবিসিকে নিশ্চিত করেছে, উপসাগরে (ওমান আর পারস্য) অবস্থান করা জাহাজগুলো আইআরজিসির কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছে। এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ আছে। এই প্রণালি পার হতে গেলে অবশ্যই আইআরজিসির অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া প্রণালিতে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে ওই জাহাজ ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’

বিকল্প পথ ব্যবহারের পরামর্শ

কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির সমুদ্রতলে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি এড়াতে চলাচলাকারী জাহাজগুলোর জন্য বিকল্প রুটের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরদিন বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের ইচ্ছুক সব জাহাজকে সামুদ্রিক নিরাপত্তার নীতিমালা মেনে চলতে ও সমুদ্রতলে পুঁতে রাখা মাইনের সম্ভাব্য বিস্ফোরণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে এই প্রণালির বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হবে।

বিবৃতিতে বিকল্প রুটগুলো বর্ণনা দিয়ে একটি মানচিত্রও দেওয়া হয়েছে। ওমান সাগর থেকে আসা জাহাজগুলোকে লারাক দ্বীপের উত্তর দিয়ে পারস্য উপসাগরের দিকে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিপরীত দিক থেকে আসা জাহাজগুলোকে পারস্য সাগর থেকে বেরিয়ে লারাক দ্বীপের দক্ষিণ দিয়ে ওমান সাগরের দিকে অগ্রসর হতে বলা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর প্রণালিটি বন্ধ করে দেয় তেহরান। পরে সমুদ্রতলে মাইন পুঁতে ও জাহাজে হামলা চালাতে থাকে আইআরজিসির নৌবাহিনী শাখা। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং ২০ শতাংশ গ্যাস পরিবহন করা হয়।

বুধবার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর কেপলারের জাহাজ-ট্র্যাকিং ডেটা ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার একটি প্রতিবেদনকে সমর্থন করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পানামার পতাকাবাহী অরোরা নামের একটি তেল ট্যাংকারকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডেটা থেকে দেখা যায়, প্রণালিটি অতিক্রম করার সময় জাহাজটি তার গতিপথ পরিবর্তন করে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যায়। এরপর জাহাজটি থেমে যায়।

চলতি সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া এক ভয়াবহ চরমপত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল হরমুজ প্রণালিটি। তিনি হুমকি দিয়েছিলেন যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি হরমুজ প্রণালিটি খুলে দেওয়া না হয়, তাহলে একটি ‘পুরো সভ্যতা’ নিশ্চিহ্ন করে দেবেন তিনি।