জানি না যুদ্ধ থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসব, আলজাজিরাকে ইসরায়েলি নাগরিক

‘এই যুদ্ধ ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের মতো নয়, হামাসের রকেট হামলার মতোও নয়। এবার ইরান মুহুর্মুহু ব্যালেস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করছে। এই যুদ্ধ অনেকদিন ধরে চলছে এবং কতদিন চলবে তা আমরা জানি না। সত্যি বলতে, আমি জানি না আমরা এর থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসব।’ এই ভাষ্য ইসরায়েলের তেল আবিবের বাসিন্দা ডালিয়া শেইন্ডলিনের। তিনি একইসঙ্গে রাজনৈতিক পরামর্শক ও জনমত জরিপকারী হিসেবে পরিচিতি।
প্রায় ৩৫ দিন ধরে চলছে ইরান যুদ্ধ। এ দীর্ঘ যুদ্ধে ইসরায়েলিদের জনজীবনের বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সার্বিক অবস্থান তুলে ধরে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে এসব কথা বলেছেন ডালিয়া শেইন্ডলিন।
প্রতিবেশী দেশগুলো এবং অবরুদ্ধ গাজায় আড়াই বছর ধরে যুদ্ধে লিপ্ত ইসরায়েলের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা আমূল বদলে গেছে।
বর্তমানে ইসরায়েল তার আঞ্চলিক প্রধান শত্রু ইরানের বিরুদ্ধে এমন এক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, যাকে দেশটির অভ্যন্তরে বারবার ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ আসলে কী হতে যাচ্ছে, তা এখনও দেখার বিষয়। তবে এই সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি সম্ভবত ইসরায়েলি পরিকল্পনাকারীদের বদলে ওয়াশিংটনের আইনপ্রণেতাদের দ্বারাই নির্ধারিত হবে।
ব্যাংক অব ইসরায়েলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা, হুথি, লেবানন এবং ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধগুলোতে ইতোমধ্যে ৩৫২ বিলিয়ন শেকেল (১১২ বিলিয়ন ডলার) খরচ হয়েছে। এই হিসাবে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ মিলিয়ন শেকেল (৯৬ মিলিয়ন ডলার) খরচ করেছে ইসরায়েল।
২০২৪ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) যুদ্ধাপরাধের দায়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। বর্তমানে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ফলে দেশটি এক ভয়াবহ আর্থিক পরিণতির আশঙ্কায় দিন গুনছে। আর এখন পর্যন্ত এই সংকটের কোনো নিশ্চিত সমাপ্তি চোখে পড়ছে না।
শেইন্ডলিন নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না ঠিক কতদিন এই যুদ্ধ সহ্য করতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘ইরান যতবার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে, প্রতিবার সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে। এই যুদ্ধ ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বা হামাসের রকেট হামলার মতো না। জানি না আমরা এর থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসব। কেউই জানে না। আমরা এখনও সবকিছুর মাঝপথে আছি।’
পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ
ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং দেশটির জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলার যে লক্ষ্য ইসরায়েল নির্ধারণ করেছিল, তা এখনও অনেক দূর বলে ধারণা করা হচ্ছে। চার সপ্তাহ ধরে ক্রমাগত বোমাবর্ষণের পরও ইরানে জনঅসন্তোষ বা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো বড় চ্যালেঞ্জের শক্তিশালী লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
মার্কিন কর্মকর্তারা জনসমক্ষে দাবি করেছেন, তারা ইরানের সামরিক শক্তি কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছেন। তবে গত ২৭ মার্চ রয়টার্স মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার পাঁচটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে।
অথচ ইসরায়েলিদের অনিয়মিত তবে ঘনঘন বিমান হামলার সতর্কবার্তার (এয়ার রেইড সাইরেন) মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর ফলে বারবার তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে হচ্ছে, যা জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ পুরোপুরি কেড়ে নিয়েছে।
একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো, জরুরি অবস্থার কারণে ইসরায়েলে অনেক স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু অভিভাবকদের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
ইসরায়েলি নাগরিকরা ক্লান্ত, তবুও মার্চ মাসের শেষের দিকে ‘ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জরিপে ৭৮ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি জানিয়েছেন, তারা যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পক্ষে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের অধিকাংশের ধারণা মার্কিন ও ইসরায়েলি পরিকল্পনাকারীরা তেহরানের সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছেন।
ইসরায়েলি রাজনীতির চরম অবস্থা
এই যুদ্ধ প্রেক্ষাপটের মধ্যে ইসরায়েলে এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে যা নব্বইয়ের দশকের ‘ওসলো চুক্তি’ অনুমোদনকারী রাজনীতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমনকি আশির দশকের সেই রাজনীতির সঙ্গেও মেলে না। অথচ বর্তমান কট্টরপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গিভির এবং তার ‘জিউইশ পাওয়ার’ পার্টির অনেক সদস্যই মূলত কাহানের সেই চরমপন্থি মতাদর্শকেই পরোক্ষভাবে সমর্থন করেন। অথচ উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা মেয়ার কাহানেকে সে সময় বহিষ্কার করা হয়েছিল।
আর এখন বেন-গিভির এবং উগ্র-অর্থোডক্স অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের মতো কট্রোরপন্থি নেতারা সরকারে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন এবং জনসমর্থনও পাচ্ছেন। বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে তৈরি করা বেন-গিভিরের ‘মৃত্যুদণ্ড আইন’ পাসের সময় যে উদযাপন দেখা গিয়েছিল, তাও এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
চলতি সপ্তাহে এই পরিস্থিতির চূড়ান্ত রূপ দেখা গেছে সুরক্ষিত বাংকার থেকে আইনপ্রণেতাদের দেওয়া রেকর্ড ২৭১ বিলিয়ন ডলারের বাজেটের মাধ্যমে। বিশ্লেষক ও বিরোধী দলগুলোর মতে, এই বাজেটের লাখ লাখ শেকেল (ইসরায়েলি মুদ্রা) উগ্র-অর্থোডক্স এবং কট্টরপন্থি বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলোর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, যাতে যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে নেতানিয়াহু সরকারের সমর্থন নিশ্চিত করা যায়।
গত সোমবার স্মোট্রিচ বলেছেন, যারা এই বাজেটের বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছে, তারা মূলত ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে, কর্মজীবী মানুষের কর ছাড়ের বিরুদ্ধে এবং ব্যাংকগুলোর ওপর কর আরোপের বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছে।
নড়বড়ে হয়ে পড়েছে ইসরায়েলের অর্থনীতি
তবে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান চরম ডানপন্থি রাজনীতি দেশটির সাধারণ মানুষের কাছে আর কতদিন গ্রহণযোগ্য থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এই অবিরাম আঞ্চলিক যুদ্ধের বিশাল আর্থিক বোঝা অচিরেই সাধারণ জনগণকে বইতে হবে।
গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘ ধ্বংসাত্মক অভিযানে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন পশ্চিমা দেশগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাধারণ সমর্থন দেখা গেছে। কিন্তু এই সপ্তাহে বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে পাস হওয়া ‘মৃত্যুদণ্ড আইনের’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তারা।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ইসরায়েল এখন পর্যন্ত যুদ্ধের প্রভাব থেকে অনেকটা সুরক্ষিত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি থেকে তারা মোটেও মুক্ত নয়। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ফলে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, কর ছাড়ের মাধ্যমে আপাতত ইসরায়েলি ভোক্তাদের সেই ধাক্কা থেকে রক্ষা করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভারের মতো বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েল যেহেতু জ্বালানি আমদানিকারক দেশ, তাই এই স্বস্তি কেবল সাময়িক।
হেভার বলেন, ইসরায়েল এর আগে যতগুলো যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার পেছনে একটি অনুমোদিত বাজেট, স্পষ্ট লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্যগুলো পরিমাপ করার জন্য একটি শক্ত আর্থিক ভিত্তি ছিল। তবে বর্তমানে আমরা এমন এক অর্থনীতি গড়ে উঠতে দেখছি, যা সাধারণত স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে দেখা যায়; যেখানে বৃহত্তর অর্থনীতির কথা বিবেচনা না করেই খামখেয়ালিভাবে সামরিক ব্যয় করা হয়।
পরিশেষে, এই যুদ্ধ কীভাবে এবং কখন শেষ হবে, তা সম্ভবত ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের চেয়ে একজন ক্রমবর্ধমান অস্থির মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের ওপর বেশি নির্ভর করছে।