পুতিন কি ইরানকে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘায়েল করতে চাইছেন

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে ইরানকে গোপনে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানের অবস্থানের তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে রাশিয়া। রুশ গোয়েন্দা স্যাটেলাইট লিয়ানার বরাতে এ তথ্য দিচ্ছে আলজাজিরা।
সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, স্যাটেলাইটটি মূলত মার্কিন নৌবাহিনীকে ট্র্যাক করার জন্যই তৈরি।
গত ১৩ মার্চ তেহরানকে মস্কোর সহায়তার প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘ব্যাপারটা সামান্যই।’ কিন্তু পরদিনই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্বীকার করেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা ততটা সামান্য নয়। অর্থাৎ বিষয়টি ট্রাম্প যতটা ছোট করে দেখাচ্ছেন, ততটা ছোট নয়।
পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থার তুলনায় রাশিয়ার সক্ষমতাকে তুলনামূলক দুর্বল বলে মনে করা হয়, বিশেষ করে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স পরিচালিত স্টারলিংক সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার যোগাযোগ ও সমন্বয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া এখনো তাদের কার্যকর গুপ্তচর স্যাটেলাইট ব্যবস্থা লিয়ানা ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করছে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক জেমস্টাউন ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো পাভেল লুজিন বলেন, ‘এই সিস্টেমের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরিসহ নৌবাহিনীর গতিবিধি নজরদারি করা এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই তথ্যের কিছু অংশ ইরানের কাছেও পৌঁছাচ্ছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
মহাকাশে দাপট
ইরানের মহাকাশ কর্মসূচির অংশ, স্যাটেলাইট খৈয়াম উৎক্ষেপণে রাশিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০২২ সালে বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে উৎক্ষেপিত প্রায় ৬৫০ কেজি ওজনের এই উপগ্রহটি পৃথিবীর প্রায় ৫০০ কিলোমিটার উচ্চতায় ঘুরে বেড়ায় এবং এক মিটার রেজোলিউশনে ছবি তুলতে সক্ষম।
লুজিন বলেন, ‘মস্কো চাইলে ইরানের অপটিক্যাল ইমেজিং স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে পারে এবং নিজেদের অন্যান্য স্যাটেলাইটের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ও করতে পারে, যা সামরিক নজরদারিতে সহায়ক হতে পারে।’
এদিকে সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিকচালিত বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে হামলার দাবি করলেও, পেন্টাগন সেটিকে ‘সম্পূর্ণ কল্পকাহিনি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। একইভাবে, ভারত মহাসাগরে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার দাবি নিয়েও ওয়াশিংটন কোনো মন্তব্য করেনি।
রাশিয়া কয়েক দশক ধরেই ইরানকে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম (বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও সাঁজোয়া যান) সরবরাহ করে আসছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে; ইরান পাল্টা হিসেবে রাশিয়াকে গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। যদিও দুই দেশ নিজেদের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে তুলে ধরে, তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই এবং রাশিয়া সরাসরি সংঘাতে জড়ায়নি।
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহোর রোমানেনকো আলজাজিরাকে বলেছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ও তেলআবিব হামলা শুরু করার পর থেকে রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য, ডেটা, বিশেষজ্ঞ এবং অস্ত্রের যন্ত্রাংশ দিয়ে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
কোমেটাসহ ড্রোন
ধীরগতির ও বিকট শব্দের হলেও সস্তা দামের শাহেদ কামিকাজে ড্রোন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। এসব ড্রোন একসঙ্গে ঝাঁক আকারে ছেড়ে ইউক্রেনের শহরগুলোতে হামলা চালানো হয়। তবে সময়ের সঙ্গে ইউক্রেন এগুলো ভূপাতিত করতে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে এবং এখন তারা বিশেষভাবে এই ধরনের ড্রোন ঠেকাতে সস্তা ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তি তৈরি ও উৎপাদন করছে, এমনকি তা অন্য দেশকেও সরবরাহ করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে অভিজ্ঞতা থেকে রাশিয়া এসব ড্রোনকে আরও উন্নত করেছে, বিশেষ করে গতিবেগ বাড়ানো, আঘাতের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্যামেরা, উন্নত নেভিগেশন সিস্টেম এমনকি কখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্ত করার মাধ্যমে এগুলোকে আরও কার্যকর করা হয়েছে। এই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কিছু অংশ আবার ইরানেও ফিরে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে ৭ মার্চ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর দক্ষিণ লেবানন থেকে ছোড়া উন্নত শাহেদ ড্রোন সাইপ্রাসে একটি ব্রিটিশ ঘাঁটিতে আঘাত হানে। এতে রাশিয়ার তৈরি স্যাটেলাইট নেভিগেশন মডিউল কোমেটা-বি ব্যবহৃত হয়েছিল, যা জ্যামিং প্রতিরোধ করে ড্রোনকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে।
রাশিয়া এখন আসল ও নকল ড্রোন একসঙ্গে পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত ও ক্লান্ত করে ফেলার কৌশলও উন্নত করেছে, যা আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হয়ে উঠছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সহায়তায় গড়ে ওঠা কৌশল ইরানকে উপসাগরীয় অঞ্চলের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সহায়তা করছে। উত্তর ইরাকের ইরবিলে পশ্চিমা বাহিনীর ব্যবহৃত একটি ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোন হামলার পর গত ১২ মার্চ ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সচিব জন হিলি বলেন, ইরানের সামরিক কৌশল ও সক্ষমতার পেছনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘অদৃশ্য হাত’ থাকতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সহযোগিতা সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে। যদি ইরান ড্রোনের ঘাটতিতে ভোগে, তাহলে রাশিয়ার কৌশল বা স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য ততটা কাজে আসবে না। রুশ বিশ্লেষক নিকিতা স্মাগিনের মতে, রাশিয়া ইরানকে কিছু গোয়েন্দা তথ্য দিলেও তা সীমিত মাত্রায় সহায়তা করে।
জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন জানান, মার্চের শুরুতে টানা কয়েক দিন প্রতিদিন প্রায় ২৫০টি ড্রোন ব্যবহার করে বড় আকারের হামলা চালানোর পর এখন ইরান সেই সক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে না; বর্তমানে তারা দিনে প্রায় ৫০টির মতো ড্রোন ব্যবহার করছে। তার মতে, এতে বোঝা যায় যে ইরান খুব দ্রুতই তার আক্রমণাত্মক সক্ষমতার একটি অংশ হারিয়ে ফেলেছে।
সহযোগিতার আগ্রহ
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সম্ভাব্য সামরিক সাফল্যে মস্কোর সরাসরি কোনো বড় আগ্রহ নেই। কারণ এই উত্তেজনা বরং ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিনের চলমান যুদ্ধকে পরোক্ষভাবে সুবিধা দিচ্ছে। ইউক্রেনের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ইহোর রোমানেনকোর ভাষায়, আকাশছোঁয়া তেলের দাম ‘পুতিনকে আরও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম করে তুলছে’।
ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল ব্যাহত করায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রুশ তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করতে বাধ্য হন। ফলে রাশিয়ার তেল রপ্তানির গতিপথেও পরিবর্তন দেখা গেছে। চীনগামী কিছু ট্যাংকার ভারতমুখী হয়ে পড়েছে এবং ইউরালস ক্রুডের দামও বেড়েছে।
রোমানেনকো বলেছেন, ইউক্রেনে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় পুতিন এখন বিভিন্ন উপায়ে চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন, যার মধ্যে ইরান-সম্পর্কিত সংঘাতকেও কাজে লাগানো হতে পারে। তবে অন্য বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া এই সংঘাতে বড় কোনো কৌশলগত জয় চায় না। বরং সীমিত গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তার মাধ্যমে ইরানকে সমর্থন দেখানোই তাদের লক্ষ্য।
মার্কিন-ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের সহযোগী ফেলো রুসলান সুলেমানভ বলেছেন, ক্রেমলিন এই যুদ্ধে কোনো যুগান্তকারী সাফল্যের চেষ্টা করছে না, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ভাঙতে ইরানকে সাহায্য করছে না। বর্তমান গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তা ‘মূলত সহযোগিতার আগ্রহের নিদর্শন, সাহায্যের একটি অলীক ধারণা তৈরির প্রচেষ্টা; তেহরানকে এটা দেখানোর জন্য যে, আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির অভাব সত্ত্বেও রাশিয়া তার বন্ধুকে বিপদে একা ফেলে দেবে না।’
তবে বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানও জানে, মস্কোর এই সহায়তা সীমিত এবং বাস্তবে খুব বেশি কার্যকর নয়। তাই ইরান নিজের কৌশলের ওপরই বেশি নির্ভর করছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রতিবেশী অঞ্চলে হামলা চালিয়ে উত্তেজনা ছড়ানো এবং তেলের দাম বাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করা।
রুসলান সুলেমানভ আরও বলেন, ‘ইরান জানে যে সামরিক শক্তির দিক থেকে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমকক্ষ নয় এবং সরাসরি যুদ্ধে তাদের পরাজিত করা সম্ভব নয়; রাশিয়ার সহায়তাও এই বাস্তবতা বদলাতে পারবে না।’
এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য মস্কো ‘হয়তো কিছুটা সাহায্য করছে’ বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়।