ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আচরণে ‘নৈতিক অবস্থান’ হারিয়েছে ইসরায়েল: ওবামা

ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আচরণের কারণে ইসরায়েল তার ‘নৈতিক উচ্চ অবস্থান’ হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তার এ বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের নির্বাচন সামনে রেখে দুই নেতার এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শুক্রবার নেতানিয়াহু ওবামার মন্তব্যের নিন্দা জানান। তবে তিনি সরাসরি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম উল্লেখ করেননি। একসময় ওবামার সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত টানাপোড়েনপূর্ণ। প্রায় এক দশক পর আবারও তাদের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ সামনে এল।
‘শক্তিশালী পক্ষের দায়িত্ব বেশি’
মঙ্গলবার বেলফাস্টে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ওবামা বলেন, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি নেতানিয়াহুকে সরাসরি এ কথা বলেছিলেন যে সংঘাতের চক্র ভাঙতে শক্তিশালী পক্ষের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।
ওবামা বলেন, ‘ইসরায়েলের মনোভাব যদি এমন হয় যে, এখন আমরা অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সেনাবাহিনীর অধিকারী, তাই আমাদের নিরাপত্তার কথা বলে আমরা যা খুশি করব, যা চাইব নিয়ে নেব এবং কারও সঙ্গে কোনো ছাড় দেব না; তাহলে তা স্বল্পমেয়াদে কাজ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি আপনাদের জন্য বিপর্যয়কর হবে।’
একই বক্তব্যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালানো ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসেরও কঠোর সমালোচনা করেন ওবামা।
ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি নিয়ে মন্তব্য
ওবামার বক্তব্যের আরেকটি অংশ ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক গুরুত্ব পায়। সেখানে তিনি ১৯৪৮ সালে হলোকাস্টের ছায়ায় ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
ওবামা বলেন, ‘সহস্রাব্দ ধরে ইহুদি জনগণ নিপীড়ন, বৈষম্য ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর বড় একটি অংশের জন্য ইউরোপ দায়ী ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এমন একটি স্থানে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজা ইহুদিদের জন্য স্বাভাবিক ছিল। তবে একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ভূমি হারানোর বিষয়টিও অস্বীকার করা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওবামার ভাষায়, ‘যা অস্বীকার করা যায় না, তা হলো তারা অন্য মানুষের ভূমি নিয়েছিল। সেই মানুষদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিরাও স্বাভাবিকভাবেই এটিকে অবিচার হিসেবে দেখেছেন এবং নিজেদের ভূমি ফিরে পেতে চেয়েছেন।
ওবামার বক্তব্যের জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্যকে ‘দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করেন।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইহুদি জনগণ তাদের পূর্বপুরুষদের ভূমিতে বিদেশি দখলদার নয়। আমাদের ইতিহাস কোনো ঔপনিবেশিক প্রকল্প নয়। আমাদের ভূমি চুরি করা ভূমি নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটাই আমাদের মাতৃভূমি। এর নাম জুডিয়া।’
জুডিয়া বলতে তিনি পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহাসিক ও বাইবেলীয় নাম ব্যবহার করেছেন। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করে।
নির্বাচন সামনে রেখে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা ওবামার সঙ্গে তার সম্পর্ক বরাবরই টানাপোড়েনপূর্ণ ছিল।
ওবামার আমলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতি নিয়ে নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছিলেন। এ সময় তিনি রিপাবলিকানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন।
আগামী ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহু বারবার দাবি করেছেন, বিদেশিরা তাকে পরাজিত করতে চায়। ইসরায়েলের কট্টর সমালোচক নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও তিনি আক্রমণ করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ওবামা ও নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্য ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, ঐতিহাসিক ভূমির অধিকার এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে চলমান বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
