বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছেন তরুণ ভোটাররা

জেনারেশন জেড বা ‘জেন-জি’ আন্দোলনের তেজ গত কয়েক বছরে দেখেছে দক্ষিণ এশিয়া। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে নির্বাচন শেষে সরকারও গঠন হয়েছে। আর তাতে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের প্রভাব ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। পশ্চিমবঙ্গে ইতোমধ্যেই প্রথম দফার ভোট শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে শেষ দফার ভোট। সড়ক, অলিগলি, দেওয়াল সবখানে প্রার্থীদের সমর্থনে পোস্টার, ব্যানার, পতাকা। ‘ভোট দিন, ভোট দিন’- এই স্লোগানে মুখরিত সর্বত্র। প্রচারে প্রতিশ্রুতির ডালি সাজিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন প্রার্থীরা। কিন্তু তাদের ওপরে তরুণ প্রজন্ম তথা জেন-জিরা কতটা ভরসা রাখেন?
পশ্চিমবঙ্গে চলমান বিধানসভার নির্বাচনে জেন-জিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৭৫ লাখের মতো। এর মধ্যে তরুণ প্রজন্মের ভোটার এক-পঞ্চমাংশের। ফলে নির্বাচনের ফলাফলে এসব ভোটারদের পছন্দ-অপছন্দ যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তরুণ প্রজন্মের ভোটার সৌতক সরকারও জানান, ভোটে অবশ্যই জেন-জি প্রভাব পড়বে। প্রতি ভোটে কম বয়সি তরুণ-তরুণী ভোটার রয়েছে, তাদের মতামত সবসময় ভোটকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
তিনি আরও জানান, শেষ দু-তিন বছরে ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আমরা গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনা দেখেছি, যা এসব দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কোথাও সেটা ভালো দিকে গেছে, কোথাও খারাপ দিকে। কিন্তু তরুণদের নেতৃত্ব প্রদান রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে একটা ধাক্কা দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও দেখা যাচ্ছে যে তরুণরা বিভিন্ন ইস্যুতে রাস্তায় নামছে এবং এই একই ধারা আগামীতে বজায় থাকবে।
তার ভাষ্য, বর্তমানে রাজ্যে ও কেন্দ্রে যে সরকার রয়েছে তারা কেউই শিক্ষা, কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছে না। ফলে কম বয়সি ভোটাররা ব্যালটেই এর জবাব দেবে।
এবারের নির্বাচনে মূলত কর্মসংস্থান, উন্নত শিক্ষা, দুর্নীতিমুক্ত শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো ইস্যুগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে জেন-জিরা। পশ্চিমবঙ্গে ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে মাসিক ভাতার মতো উদ্যোগগুলো তরুণদের টানার চেষ্টা হলেও, তারা স্থায়ী কর্মসংস্থানকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
দেবমিত্রা ঘোষ রায় নামের একজন বলেন, আমরা চাইছি সবার জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থান। সমস্ত বন্ধ কলকারখানার দরজা খুলে যাক। শিক্ষিত বেকার যুবকরা স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ পাক। স্কুল ছুটেরা আবার স্কুলে ফিরে যাক।
জেন-জি কেবল ভোটার নয়, বরং নির্বাচনকে প্রভাবিত করার মতো একটি সচেতন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এই প্রজন্ম পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি, ভোটদান এবং ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৯ আগস্ট কলকাতার সরকারি আরজিকর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় নৃশংসভাবে ধর্ষণ এবং খুনের শিকার হন এক ইন্টার্ন নার্স। এরপর পশ্চিমবঙ্গের গণ্ডি পেরিয়ে সেই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভারতের, যার নেতৃত্বে ছিল জেন-জি।
সেই প্রজন্মেরই এক তরুণ সদস্য অমিত দাস জানান, যে সমাজে নারী সুরক্ষা রয়েছে, জেন-জি সেই সমাজই প্রত্যাশা করে। তার দাবি, পশ্চিমবঙ্গে শিল্প নেই, চাকরি নেই, কলকারখানা নেই তাহলে কি করে নতুন প্রজন্ম সারভাইভ করবে? আমরা চাই এই সরকারের পরিবর্তন। গত ১৫ বছর ধরে এই সরকারকে দেখেছি। পরিবর্তনের পর নতুন সরকারও যদি কাজ না করে তাহলে তরুণ প্রজন্ম তাকেও সরিয়ে দেবে।
প্রবীর দাস নামে একজন বলেন, তরুণদের একটা বড় জায়গা হলো ভারত। পশ্চিমবঙ্গ তার ব্যতিক্রম নয়। এই নতুন প্রজন্ম বিভিন্ন কারণে আশাহত। মেধাবী উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থানের জন্য অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছেন। তার অভিমত ভাতা কখনো চাকরির বিকল্প হতে পারে না। সোশ্যাল মিডিয়া একটা প্রতিবাদের জায়গা। সেক্ষেত্রে শিক্ষিত বেকার যুবকরা যখন তাদের মতামত সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানান তখন তা দেখে বাকিরাও প্রভাবিত হয়।
কিন্নয় রায় চৌধুরী নামে আরেক যুবক জানান, পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার অবকাঠামোই নেই, কর্মসংস্থান নেই। ফলে তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা কেউ কর্মসংস্থানের জন্য বাইরে চলে যাচ্ছেন, কেউবা ভালো শিক্ষার অভাবে বাধ্য হয়ে কম বেতনের চাকরিতে যুক্ত হচ্ছেন। সেক্ষেত্রে তারুণ্যের ভোট এবার শিক্ষা, কাজের দাবিতে হবে।
সৈকত বৈরাগ্য জানান, এই তরুণ প্রজন্মই আগামী দিনের ভবিষ্যত। কিন্তু রাজ্যের বর্তমান সরকারের থেকে এই তরুণ প্রজন্ম কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না। ১৫০০ রুপি ভাতা দিয়ে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যত নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন বাকি থাকলেও ভারতের বাকি চার রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। রাজ্যগুলো হলো তামিলনাড়ু, কেরালা, আসাম ও পুদুচেরি। প্রতিটি রাজ্যের ভোটেই তরুণ ভোটারদের ক্রমবর্ধমান নির্বাচনী প্রভাবের বিষয়টি সামনে এসেছে। পাঁচ রাজ্যেই ভোটের ফলাফল জানা যাবে আগামী ৪ মে।