কোনো দায়িত্বে না থাকা মোজতবা খামেনি যেভাবে ইরানের সুপ্রিম লিডার হলেন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। রোববার (৮ মার্চ) ইরানের ধর্মীয় নেতাদের পরিষদ অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদের জন্য বাছাই করে।
বিবিসির খবরে খবরে বলা হয়েছে, ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার এর আগে কখনো কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। জনসমক্ষে বক্তৃতা বা সাক্ষাৎকারও দেননি এবং তার খুব সীমিত সংখ্যক ছবি ও ভিডিও প্রকাশ হয়েছে। তবে বহুদিন ধরেই গুঞ্জন রয়েছে, তার বাবার কাছে যাওয়ার গেটকিপার হিসেবে প্রভাব ছিল তার। ২০০০ দশকের শেষ দিকে উইকিলিকসে প্রকাশিত মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাকে ‘আড়ালের শক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, মোজতবা খামেনি কখনও নির্বাচনে অংশ নেননি বা ভোটের মুখোমুখি হননি। তবে তিনি তার বাবার ঘনিষ্ঠ পরিমণ্ডলের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। বিশেষ করে আইআরজিসির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবেও আলোচনায় দেখা গেছে।
মোজতবা খামেনির নির্বাচন ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর কঠোরপন্থি অংশের শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান খুব দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় যেতে আগ্রহী নাও হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন সর্বোচ্চ নেতার নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, ‘ওয়াশিংটনের অনুমোদন ছাড়া নির্বাচিত কেউ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।’ তবে ইরানের কর্মকর্তারা এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, দেশের ভবিষ্যৎ কেবল ইরানের জনগণই নির্ধারণ করবে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের মন্তব্যকে কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘প্রিয় ইরানের ভাগ্য নির্ধারণ করবে গর্বিত ইরানি জাতি, বাইরের কোনো শক্তি নয়।’
বিশ্লেষকদের মতে, আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলের এই নিয়োগ একদিকে যেমন নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র অটুট রয়েছে, তেহরান যেন সেটিই দেখাতে চাইছে।
এদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তেহরানে নিহত হন আলি খামেনি। সেই হামলাকে কেন্দ্র করেই নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে দাঁড়িয়ে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরো রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়েছে। নতুন নেতা ঘোষণার পরপরই ইরানের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব তার প্রতি সমর্থন জানায়। আইআরজিসি এবং সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও তার নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি সবাইকে নতুন সর্বোচ্চ নেতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, ১৯৬৯ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন মোজতবা। তিনি আলি খামেনির ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। তেহরানের ধর্মীয় আলাভি স্কুলে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন। খবরে বলা হচ্ছে, মোজতবা একজন মধ্যম পর্যায়ের আলেম। তিনি তার বাবার মতো ‘আয়াতুল্লাহ’ উপাধি ধারণ করেন না। তবে ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি হাবিব ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরে গোয়েন্দা ও বাসিজ কমান্ডারসহ নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ পর্যায়ে ওঠা ব্যক্তিদের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, আইআরজিসির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মোজতবার প্রভাবের পেছনে আইআরজিসির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত কিছু কিছু খবরে বলা হচ্ছে, তাকে সমর্থন দিতে আইআরজিসি বিশেষজ্ঞ পরিষদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিদেশি সরকারগুলো মোজতবাকে নির্বাচন রাজনীতি ও নিরাপত্তা দমনপীড়নে ভূমিকা রাখার দায়ে অভিযুক্ত করে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে সময় মার্কিন ট্রেজারি জানায়, আলী খামেনি তার কিছু ক্ষমতা ছেলের কাছে ন্যস্ত করেছিলেন এবং নির্বাচিত পদে না থাকলেও তিনি আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধির ভূমিকা পালন করতেন।
সর্বোচ্চ নেতা ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং আইআরজিসির প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা দীর্ঘদিন সর্বোচ্চ নেতার কার্যক্রমে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছেন এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা বলয়ের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তবে নিউইয়র্ক টাইমস গত বছরের এক খবরে জানিয়েছিল, আলী খামেনি তার পরবর্তী উত্তরসূরি হিসেবে যে তিনজন জ্যেষ্ঠ আলেমের নাম বিবেচনায় নিয়েছিলেন, সেখানে মোজতবার নাম ছিল না।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরানে শীর্ষ নেতার মৃত্যু মানেই তাৎক্ষণিক শাসন পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামো সাধারণত ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।