logo

শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো, যেভাবে বদলে দিচ্ছে বৈশ্বিক আবহাওয়া

বিবিসি
বিবিসি
শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো, যেভাবে বদলে দিচ্ছে বৈশ্বিক আবহাওয়া
ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভায় মারাত্মকভাবে ফাটল ধরা ও শুকিয়ে যাওয়া একটি ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে ভেড়া নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন মেষপালক। ছবি: ইপিএ

বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দে বড়সড় পরিবর্তন ঘটাচ্ছে এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার এই প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়ার প্রভাবে বিভিন্ন দেশে দেখা দিচ্ছে চরম আবহাওয়া। কোথাও ভয়াবহ দাবানল ও খরা, কোথাও আবার প্রবল বৃষ্টিপাত, বন্যা এবং শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বাড়ছে। ইন্দোনেশিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের মতো দেশগুলো এর প্রভাবের মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এল নিনোর তীব্রতা বৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক করেছে। প্রতিবেদনটিতে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত এর প্রভাব বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

কী এই এল নিনো, কেন বদলে যায় আবহাওয়া?

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। এর ফলে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব অবশ্য এক রকম নয়। কোথাও খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সমুদ্রের উষ্ণতা ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঝড়ের তীব্রতা ও গতিপথ নির্ভর করে সমুদ্রের তাপমাত্রা ছাড়াও বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর।

ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানল, বিপন্ন জনজীবন

এল নিনোর প্রভাবে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শুষ্কতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে প্রায় ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমি দাবানলে পুড়ে গিয়েছে। এই এলাকা বৃহত্তর লন্ডনের আয়তনের প্রায় ছয় গুণ। গত বছরের তুলনায় এ বছর দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

দাবানলের জেরে কয়েকটি এলাকায় স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে। আগুনের ধোঁয়া ও বিষাক্ত ধোঁয়াশায় সুমাত্রা ও কালিমান্তানের বহু মানুষ সমস্যায় পড়েছেন। প্রতিবেদনে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বহু শিশুও রয়েছে, যাদের কাশি, ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা

পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বাতাসের গতির পরিবর্তন ঝড়ের দ্রুত শক্তি বাড়ানোর অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। প্রতিবেদনে চলতি মৌসুমে একাধিক শক্তিশালী ঝড় ও হ্যারিকেন তৈরির কথা বলা হয়েছে।

এতে ‘পলো’ নামে একটি হ্যারিকেনের উল্লেখ রয়েছে, যা ঘণ্টায় প্রায় ২৮৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস সৃষ্টি করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে ‘ওদালিস’ ও ‘নোলো’ নামে আরও দুটি হ্যারিকেনের উপস্থিতির কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এই ঝড়গুলোর নাম, সময়কাল ও পরিসংখ্যানের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরেও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পূর্ব চীন ও জাপানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে সেখানে এ বছর ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধির কথাও জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অঞ্চলে অনুকূল সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি ঘূর্ণিঝড়কে শক্তিশালী করে তুলতে পারে। ফলে চীন ও জাপানের মতো উপকূলবর্তী দেশগুলোতে নতুন করে দুর্যোগের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

আটলান্টিকে উল্টো ছবি, কমেছে হ্যারিকেনের তৎপরতা

প্রশান্ত মহাসাগরে ঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধির বিপরীতে উত্তর আটলান্টিকে এল নিনোর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন ঘূর্ণিঝড় তৈরির অনুকূল পরিবেশকে দুর্বল করতে পারে। এর ফলে সেখানে হ্যারিকেনের কার্যকলাপ তুলনামূলকভাবে কম থাকার কথা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে আটলান্টিকে ঝড়ের সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় কম ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও আলাবামায় আঘাত হানা ‘ইসায়াস’ নামে একটি হ্যারিকেনের উল্লেখও করা হয়েছে। তবে ঝড়ের নাম, আঘাতের সময় এবং মৌসুমভিত্তিক পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া সংস্থার তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।

ভারতে বৃষ্টির ঘাটতি, কৃষিতে বাড়ছে উদ্বেগ

এল নিনোর প্রভাব ভারতের মৌসুমি বৃষ্টিপাতেও পড়তে পারে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিকভাবে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম হয়েছে। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতির মাত্রা ছিল ভিন্ন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্য ভারতে বৃষ্টিপাত তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকলেও পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে ঘাটতি ছিল প্রায় ২৬ শতাংশ। দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি অঞ্চলেও বৃষ্টিপাত প্রায় ২৪ শতাংশ কম হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এই অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষিক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়ার পর হঠাৎ অতিবৃষ্টি হলে ফসলের ক্ষতি, মাটির আর্দ্রতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং কৃষিকাজের সময়সূচিতে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থাকে। ফলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহের উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

বিশ্বজুড়ে প্রস্তুতির প্রয়োজন

এল নিনো নিজেই সব চরম আবহাওয়ার একমাত্র কারণ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয় আবহাওয়াগত পরিস্থিতি, ভূমির ব্যবহার এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতির মতো একাধিক বিষয় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করে। তবু এল নিনোর মতো বড় আকারের জলবায়ুগত পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

দাবানল, খরা, বন্যা কিংবা ঘূর্ণিঝড়; প্রতিটি ক্ষেত্রেই আগাম সতর্কতা, নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।