যুদ্ধের চার বছর: রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে বৈঠকে ইইউ নেতারা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের চতুর্থ বার্ষিকীর প্রাক্কালে ইউক্রেনে রাশিয়ার নতুন হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দক্ষিণের ওডেসা অঞ্চলে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে রুশ ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হন।
এদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ২০তম নিষেধাজ্ঞা আরোপে ব্রাসেলসে বৈঠকে বসেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত সামুদ্রিক পরিষেবার ওপর নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। খবর আলজাজিরার।
টেলিগ্রামে দেওয়া বার্তায় গভর্নর ওলেহ কিপার জানান, শিল্প স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। উৎপাদন ও গুদামঘর, প্রশাসনিক ভবন, গাড়ির ডিলারশিপ এবং বেশ কিছু যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আলজাজিরা জানিয়েছে, একটি ড্রোন বহুতল ভবনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে আঘাত করলেও সেটি বিস্ফোরিত হয়নি। বাসিন্দাদের সহায়তায় রাজ্য জরুরি পরিসেবার মনোবিজ্ঞানীরা কাজ করেন। উদ্ধারকারীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন এবং জরুরি ও পৌর কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে তৎপর ছিল।
দক্ষিণ-পূর্বের জাপোরিঝিয়া অঞ্চলেও ব্যাপক হামলার খবর পাওয়া গেছে। আঞ্চলিক গভর্নর ইভান ফেডোরভ জানান, রাশিয়া ৪৪টি বসতিতে ৭৫০টির বেশি হামলা চালিয়েছে। এতে জাপোরিঝিয়া শহরে আরও দুজন নিহত হন।
আরও উত্তরে খারকিভের খোলোদনোগিরস্কি জেলায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে বলে শহরের মেয়র ইহোর তেরেখভ জানান। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি; জরুরি দলগুলো ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ করছে।
এদিকে ইউক্রেন দাবি করেছে, তারা রাতারাতি ১০৫টি রুশ ড্রোন ভূপাতিত করেছে। পাল্টা রাশিয়া জানিয়েছে, তারা ১৫২টি ইউক্রেনীয় ড্রোন আটক করেছে।
তহবিল, নিষেধাজ্ঞা, লড়াই তীব্রতর হচ্ছে
সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ব্রাসেলসে বৈঠকে বসেছেন। আলোচনার মূল বিষয় কিয়েভের জন্য নতুন ঋণ প্যাকেজ এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ২০তম ধাপ।
নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত সামুদ্রিক পরিষেবার ওপর নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। পাশাপাশি ইউরোপীয় কমিশন রাশিয়ার আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের সক্ষমতা আরও সীমিত করতে অতিরিক্ত আর্থিক বিধিনিষেধের প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে মস্কোর যুদ্ধ পরিচালনার অর্থায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
কিয়েভের জন্য প্রস্তাবিত ৯০ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১০৬ বিলিয়ন ডলার) ঋণ ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন সরকারের আর্থিক চাহিদা মেটাতে সহায়তা করবে। এই ঋণ প্রাথমিকভাবে গত ডিসেম্বরে সম্মত হয় এবং ইউরোপীয় সংসদে অনুমোদিত হয়।
তবে বিষয়টি জটিল হয়ে উঠেছে হাঙ্গেরির আপত্তিতে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার সিজ্জার্তো জানিয়েছেন, দ্রুজবা পাইপলাইনের মাধ্যমে হাঙ্গেরিতে রাশিয়ান তেল সরবরাহ পুনরায় শুরু না হলে বুদাপেস্ট এই ঋণ আটকে দিতে পারে।
ইউক্রেনীয় সূত্রের দাবি, জানুয়ারির শেষ দিক থেকে রাশিয়ার বোমা হামলার কারণে তেলের প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া এখনো পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়ান তেল নিচ্ছে; তাদের অভিযোগ, ইউক্রেন ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ পুনরায় শুরুতে বাধা দিচ্ছে। ফলে ইউক্রেনকে সহায়তা এবং রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর প্রশ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরেই নতুন করে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
‘চমকপ্রদ’ অবস্থান
এদিকে ব্রাসেলসে বৈঠকের আগে পোল্যান্ডের শীর্ষ কূটনীতিক রাডাস্লা সিকোরস্কি হাঙ্গেরির অবস্থানকে ‘চমকপ্রদ’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গাস সাহকনা বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা আটকে রাখার ‘বাস্তবে কোনো কারণ নেই’। তার দাবি, দ্রুজবা পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়ার জন্য ইউক্রেন নয়, বরং রাশিয়াই দায়ী।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে না পারি, তাহলে রাশিয়াই খুশি হবে।’
এদিকে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াদেফুল হাঙ্গেরির অবস্থান নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, ‘হাঙ্গেরির অবস্থান দেখে আমি অবাক। আমরা আমাদের হাঙ্গেরীয় সহকর্মীদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করব।’ তবে তিনি আশাবাদী সুরে যোগ করেন, ‘দিনশেষে আমরা সফল হব বলেই আমি বেশি আত্মবিশ্বাসী।’