এক বছরে জনসংখ্যা কমল ৩৪ লাখ, নতুন উদ্বেগে চীন

চীনের জনসংখ্যা এক বছরের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ৩৪ লাখ। ২০২৫ সালে দেশটিতে জন্মের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় টানা চতুর্থবারের মতো জনসংখ্যা হ্রাস পেল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে। এই জনমিতিক পতন চীনের অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও দীর্ঘমেয়াদি শক্তি সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর (এনবিএস) প্রতিবেদনের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, ২০২৫ সালে চীনে ৭৯ লাখ ২০ হাজার শিশু জন্ম নিয়েছে। এর বিপরীতে এক বছরে এক কোটি ১৩ লাখ ১০ হাজার মানুষ মারা গেছেন। ফলে মোট জনসংখ্যা কমেছে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার। বর্তমানে চীনের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ কোটিতে, যা ভারতের পর বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
একই সঙ্গে দেশটির জন্মহার নেমেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ২০২৫ সালে প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে জন্মহার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৬৩। ২০১৬ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকা জন্মহারের ধারায় এটি সর্বনিম্ন। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, ২০২৪ সালে জন্মসংখ্যায় যে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল, তা স্থায়ী কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়।
জনসংখ্যা সংকটের এই চিত্রের মধ্যেই সরকার জানিয়েছে, ২০২৫ সালে চীনের অর্থনীতি ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা সরকারের নির্ধারিত ‘প্রায় ৫ শতাংশ’ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে বছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনৈতিক গতি কমে আসে। শেষ তিন মাসে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে, যা ২০২২ সালের শেষের পর সবচেয়ে ধীর।
অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে রপ্তানি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনা এবং দেশের অভ্যন্তরে দুর্বল ভোগব্যয়ের মধ্যেও চীন গত বছর রেকর্ড ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ সত্ত্বেও এই সাফল্য এসেছে।
তবে জনসংখ্যার কাঠামোতে পরিবর্তন চীনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে, বিপরীতে দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। ২০২৫ সালে চীনে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ কোটি ৩০ লাখে, যা মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ।
জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে চীনের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হতে পারে ৬০ বছরের বেশি বয়সী। এর প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও পড়তে পারে।
এই বাস্তবতায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘জনসংখ্যাগত নিরাপত্তা’কে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় উৎপাদন খাতে রোবট ও স্বয়ংক্রিয়তার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে।
সরকার জন্মহার বাড়াতে নানা প্রণোদনা চালু করেছে। তিন বছরের কম বয়সী সন্তান রয়েছে— এমন পরিবারকে নগদ ভাতা, বিয়ে নিবন্ধন সহজীকরণ ও বিনামূল্যে সরকারি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়েও কর ছাড়, আবাসন সহায়তা ও প্রসূতি ছুটি বাড়ানোর মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের চাকরির অনিশ্চয়তা, সন্তান প্রতিপালনের উচ্চ ব্যয় এবং শিশুপালনের দায়িত্বে নারীদের ওপর অসম চাপ— এই বাস্তবতায় জন্মহার পতনের ধারা থামানো চীনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।