logo

যুক্তরাজ্যে মুসলিমবিরোধী নিউজের অর্ধেকই পক্ষপাতমূলক

যুক্তরাজ্যে মুসলিমবিরোধী নিউজের অর্ধেকই পক্ষপাতমূলক

যুক্তরাজ্যে মুসলিমবিরোধী ঘৃণামূলক অপরাধ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমেও মুসলিমদের নিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ কভারেজ বেড়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। দেশটির গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রায় ৭০ শতাংশ নিবন্ধ ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে। সোমবার (৯ মার্চ) এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং (সিএফএমএম)।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যের ৩০টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রায় ৪০ হাজার ৯১৩টি নিবন্ধ বিশ্লেষণ করেছে সংস্থাটি। এসব প্রতিবেদনের প্রায় ৭০ শতাংশে মুসলিম বা ইসলামকে নেতিবাচক ঘটনা, আচরণ বা সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। আর অর্ধেক বা ২০ হাজার নিবন্ধ ‘উচ্চ মাত্রার পক্ষপাতমূলক’।

প্রতিবেদনটি বলছে, গণমাধ্যমে এই ধরনের ধারাবাহিক উপস্থাপন জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে এবং সমাজে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ বা ভুল ধারণা বাড়িয়ে দিতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।

সিএফএমএম কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে পাঁচটি বড় ধরনের পক্ষপাতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই পাঁচটি ক্ষেত্র হলো নেতিবাচক কভারেজ, সাধারণীকরণ, ভুল উপস্থাপনা, প্রাসঙ্গিক তথ্য বাদ দেওয়া এবং শিরোনামে মিসলিডিং করা হয়েছে।

এই তালিকায় রয়েছে দ্য স্পেক্টেটর ম্যাগাজিন ও জিবি নিউজ (৩৯ শতাংশ) টেলিভিশন চ্যানেল। এছাড়া আরও কয়েকটি সংবাদপত্রের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন দ্য টেলিগ্রাফ (৩২ শতাংশ), ইহুদি ক্রনিকল, ডেইলি এক্সপ্রেস (২৪ শতাংশ), দ্য সান (২১ শতাংশ), ডেইলি মেইল (২০ শতাংশ) এবং দ্য টাইমস (২২ শতাংশ)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব গণমাধ্যমে দেখা যাওয়া ক্ষতিকর কভারেজ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ।

অন্যদিকে কিছু সংবাদমাধ্যমকে তুলনামূলকভাবে কম পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইটিভি, মেট্রো পত্রিকা, বিবিসি (৬ শতাংশ), পিএ মিডিয়া, দ্য গার্ডিয়ান (১১ শতাংশ), অ্যাসোসিয়েট প্রেস বা এপি, ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড এবং স্কাই নিউজ।

ব্রিটেনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা বৈরিতার প্রেক্ষাপটে এই গবেষণা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং অভিবাসনবিরোধী মনোভাব বাড়ার সঙ্গে এই পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে।

সিএফএমএমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে গণমাধ্যমে মুসলিমদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হলে তা সমাজে ঘৃণামূলক অপরাধ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানে বৈষম্য এবং কঠোর নীতির প্রতি সমর্থন বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।

অক্টোবরে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চে শেষ হওয়া বছরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ঘৃণামূলক অপরাধ আগের সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে।

সরকারের মতে, ২০২৪ সালে সাউথপোর্টে একটি মেয়েদের নাচের ক্লাসে গণহত্যার ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন কাল্পনিক মুসলিম অভিবাসীকে দায়ী করে ছড়ানো প্রচারণা মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষ বাড়িয়ে দেয়।

এরপর থেকে বিভিন্ন স্থানে মসজিদকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। একই সঙ্গে ব্রিটিশ মুসলিম ও অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুরা জানিয়েছেন, দেশে জাতীয়তাবাদী মনোভাব বাড়ার কারণে তাদের মধ্যে অস্বস্তি এবং নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এই পরিস্থিতির পেছনে ডানপন্থি রাজনৈতিক দল রিফর্ম ইউকের উত্থানকেও একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাজ্যে যে ধরনের বর্ণবাদী প্রবণতা আবার সামনে আসছে, তা অনেকটা ১৯৭০ ও ১৯৮০–এর দশকে দেখা বৈষম্যের স্মৃতি ফিরিয়ে দিচ্ছে।

সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং একটি উদাহরণ তুলে ধরেছে যেখানে ডানপন্থী মিডিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্যকে অতিরিক্ত জোর দিয়ে উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে লন্ডনকে ‘শরিয়া আইনের অধীনে পরিচালিত’ দাবি করেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি লন্ডনের দিকে তাকাই, যেখানে একজন ভয়ঙ্কর মেয়র আছেন… এখন তারা শরিয়া আইনে যেতে চায়। কিন্তু আপনি অন্য দেশে আছেন। আপনি তা করতে পারবেন না।’

যদিও মেট্রোর মতো কিছু সংবাদমাধ্যম এই দাবির সত্যতা যাচাই করেছে এবং দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রাসঙ্গিক মন্তব্য করেছে; ডেইলি এক্সপ্রেসের মতো পত্রিকাগুলো অভিযোগটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে আরও সামনে নিয়ে গেছে।

গবেষকরা বলেন, ‘বিতর্কিত, ভিত্তিহীন দাবি উপস্থাপন করা ভুল তথ্যকে স্বাভাবিক করে এবং মুসলিম-বিরোধী আখ্যানকে উস্কে দেয়। এতে মিডিয়ার দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, সাবধানতার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করা না হলে মিথ্যাকে বৈধতা দেওয়া হয়।’

সিএফএমএমের পরিচালক রিজওয়ানা হামিদ, ‘যুক্তরাজ্যে পরিচালিত এই ধরনের সবচেয়ে বড় গবেষণায়। আমাদের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যমে মুসলমানদের চিত্রায়নে কাঠামোগত পক্ষপাত গভীরভাবে উদ্বেগজনক। এই গবেষণার ফলাফল মিডিয়ার দায়িত্ব, প্রতিনিধিত্ব এবং যুক্তরাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক ও সামাজিক সংহতির ওপর পক্ষপাতদুষ্ট কভারেজের প্রভাব সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।’

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত বছরের শেষ দিকে আইটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই পরিস্থিতি ‘আমাদের দেশকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে’।

সূত্র: আলজাজিরা, ইয়েনি শাফাক