দাস প্রথায় ফ্রান্সের ভূমিকার জন্য চাপের মুখে ম্যাখোঁ

দাস প্রথার ইতিহাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষণ দিতে গিয়ে নতুন করে চাপের মুখে পড়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। আফ্রিকান জনগণকে দীর্ঘদিন দাস বানিয়ে রাখার ঘটনায় প্যারিসের ভূমিকার জন্য ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচার নিয়ে আলোচনা শুরুর দাবি উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) ফ্রান্স ২০০১ সালের একটি ঐতিহাসিক আইনের ২৫ বছর পূর্তি পালন করছে। ওই আইনের মাধ্যমে ফ্রান্স প্রথম দেশ হিসেবে দাস ব্যবসা ও দাস প্রথাকে মানবতাবিরোধী অপরাধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আইনটি প্রস্তাব করেছেলেন ফরাসি গায়ানার শীর্ষস্থানীয় সংসদ সদস্য ক্রিস্টিয়ান তোবিবার।
ম্যাখোঁর কার্যালয় জানিয়েছে, ‘দাস প্রথা ও দাস ব্যবসার স্মৃতি সংরক্ষণ প্রেসিডেন্টের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ সময়ের দিকে এসে ম্যাখোঁর ওপর চাপ বাড়ছে, যাতে তিনি ফ্রান্সে দাস প্রথার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেন।
এদিকে দেশটিতে রাজনীতি, গণমাধ্যম ও সমাজে বর্ণবাদ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে জনমত জরিপে উগ্র ডানপন্থিদের সমর্থনও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন এক সময়, যখন ফ্রান্স ক্ষোভের মুখে রয়েছে। কারণ মার্চে জাতিসংঘে হওয়া এক ভোটে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।
ওই প্রস্তাবে আন্তঃআটলান্টিক দাস ব্যবসাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’ বলা হয় এবং ‘ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রতিকার হিসেবে ক্ষতিপূরণের’ আহ্বান জানানো হয়।
গুয়াডেলুপের সিনেটর ভিক্টোরিন লুরেল ম্যাখোঁকে লেখা একটি খোলা চিঠিতে বলেন, ভোটদানে বিরত থেকে ফ্রান্স একটি ‘নৈতিক, ঐতিহাসিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ভুল’ করেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে নিজের ভাবমূর্তি ‘ক্ষুণ্ণ’ করেছে।
ষোড়শ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে পর্তুগাল ও ব্রিটেনের পর ফ্রান্সই ছিল আটলান্টিক এবং ভারত মহাসাগরজুড়ে দাস পাচারকারী তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে জোরপূর্বক নিয়ে আসা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের (নারী-শিশুসহ) মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশকে অপহরণ ও দাস বানানোর জন্য ফ্রান্স দায়ী ছিল।
ফ্রান্সে যারা সংলাপ প্রক্রিয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ডিসেন্ডেন্টস অব দ্য হিস্ট্রি অব স্লেভারির প্রধান দিওদোনে বুত্রাঁ। তিনি বেনিন থেকে ফরাসি ক্যারিবিয়ান দ্বীপ মার্টিনিকে পাচার হওয়া ক্রীতদাস আফ্রিকানদের বংশধর।
বুত্রাঁ কাজ করছেন পিয়ের গিয়োঁ দ্য প্রিন্সের সঙ্গে, যিনি নান্তেসের অষ্টাদশ শতাব্দীর দাসবাহী জাহাজ মালিকদের বংশধর। গত মাসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান, কারণ তার পূর্বপুরুষরা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ আফ্রিকান দাসকে ক্যারিবিয়ানে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এদের মধ্যে অন্তত ২০০ জন সমুদ্রযাত্রার সময় মারা যান।
বুত্রিন ও গিয়োঁ দ্য প্রিন্স চলতি মাসে ম্যাখোঁকে চিঠি লিখে ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচার নিয়ে আলোচনা শুরু করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
তারা বলেন, এমনটি হলে আমাদের সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে আস্থা ফেরাবে, ইতিহাসের বাস্তবতা স্বীকার করবে, ভ্রাতৃত্বের চেতনা জাগিয়ে তুলবে এবং হীনমন্যতায় ভোগা অশ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়গুলোর মানসিক ক্ষত নিরাময় করবে। দাস প্রথা এমন একটি ক্ষত যার দাগ বর্ণবাদের মাধ্যমে আজও দৃশ্যমান, এর বিস্তার আমরা এখন পর্যন্ত থামাতে পারিনি।
ফ্রান্সের ফাউন্ডেশন ফর দ্য রিমেমব্রেন্স অব স্লেভারির পরিচালক আইসাতা সেক ও এর সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী জঁ-মার্ক আইরো গত মাসে ম্যাখোঁকে একটি খোলা চিঠি লেখেন। চিঠিতে তারা দাসত্বের উত্তরাধিকার হিসেবে সৃষ্ট বর্ণবাদ ও বৈষম্যের মোকাবিলা এবং প্রতিকারের উপায় নিয়ে সংলাপ শুরু করার ক্ষেত্রে ফ্রান্সকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বৈশ্বিক আলোচনায় প্যারিসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। কারণ বেশ কয়েকটি ‘বিদেশি বিভাগ ও অঞ্চল’ ফ্রান্সের অংশ হয়ে রয়েছে। যেমন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মার্টিনিক ও গুয়াদেলুপ, ফরাসি গায়ানা এবং ভারত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ রিইউনিয়ন ও মায়োত।
স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মতে, এসব এলাকায় কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার খরচ, দূষণ ও পরিবেশ সুরক্ষায় যে বৈষম্য ও অসমতা দেখা যায়, তা মূলত দাস প্রথা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের সরাসরি প্রভাবের ফল।
১৮২৫ সালে হাইতি বিপ্লব হয়। এরপর দাস মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য হাইতির ওপর কঠোর আর্থিক জরিমানা আরোপ করেছিল ফ্রান্স। ফলে দেশটি হাইতিকে সম্ভাব্য শত শত কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবির সম্মুখীন হচ্ছে। এই ঋণের জন্য বহু হাইতিবাসী দুই শতাব্দীর অস্থিরতাকে দায়ী করে। জরিমানাকৃত অর্থ ১৯৪৭ সালেই সম্পূর্ণরূপে ফ্রান্সকে পরিশোধ করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের জন্য ম্যাক্রোঁ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হাইতির সঙ্গে একটি যৌথ কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চলতি বছরের শেষের দিকে আসার কথা রয়েছে।
১৭৯৪ সালে প্রথমবার নিষিদ্ধ হওয়ার পর ১৮০২ সালে ফ্রান্সের নেপোলিয়ন দাস প্রথার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অবশেষে ১৮৪৮ সালে দাস প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। মালিকরা তাদের অধনস্ত দাসদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান




