হঠাৎ মাছ হাতে প্রচারণায় প্রার্থীরা, নেপথ্যে কী

বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। প্রার্থীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ভোটারের। ভোটাররাও বিষয়টা বেশ উপভোগ করছেন। প্রার্থীদের নাগাল পেয়ে ভোটদানের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। কারণ প্রথম দফার ভোটগ্রহণের বাকি আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। তবে শেষ সময়ে এসে নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা গেছে কিছু ব্যতিক্রমী চিত্র।
কলকাতা শহরে ঐতিহ্যবাহী ঝকঝকে সাদা ও লাল পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তিকে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে দেখা গেছে। তার নাম কৌস্তব বাগচি। হাতে রয়েছে মাছ। আর পেছনে ঢাকের শব্দ ও সমর্থকদের নানান স্লোগান। যেন ঢাকঢোল পিটিয়ে উৎসবে নেমেছেন তারা।
আইনজীবী থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া কৌস্তব বাগচি এবার ব্যারাকপুর থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মূলত মানুষকে নীরবে প্রভাবিত করতে মাছ নিয়ে মিছিল করছেন তিনি।
এর কয়েক কিলোমিটার দূরে কলকাতার বন্দর এলাকায় বিজেপির আরেক প্রার্থী রাকেশ সিংও একই ধরনের কাণ্ড ঘটান। জাঁকজমকপূর্ণ পোশাকে সজ্জিত হয়ে ও দলীয় কর্মীদের নিয়ে তিনি ভোরবেলার ভিড়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় বারবার একটি মাছ উঁচিয়ে ধরেন। রাজ্যের অন্যতম হাই-প্রোফাইল এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি শহরের মেয়র ফিরহাদ হাকিমের প্রতিপক্ষ হয়ে লড়ছেন।
জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গে মাছ শুধু খাবার নয়, আচার-অনুষ্ঠান ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মাছ পরিচয় ও আপনত্বের পরিচায়কও বটে। তবে গোটা পশ্চিমবঙ্গে এবার ঘটেছে নাটকীয় পরিবর্তন। প্রার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে মাছ।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মাছ উৎপাদনকারী ও মৎস্য চাষে দ্বিতীয় দেশ হওয়া সত্ত্বেও, মাথাপিছু মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী এর অবস্থান ১২৯তম। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মাছ শুধু খাদ্যই নয়, এটি প্রায় সর্বজনীন।
২০২৪ সালে আইসিএআর ও ওয়ার্ল্ডফিশের একটি যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৬৫.৭ শতাংশ মানুষ প্রতি সপ্তাহে মাছ খেয়ে থাকেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, এটি পূর্ব ও দক্ষিণের সেই রাজ্যগুলোর পাশাপাশি অবস্থান করছে যেখানে ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ মাছ খায়, যদিও সামগ্রিকভাবে ভারতে মাছ খাওয়ার পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে এবং এখন তা জনসংখ্যার ৭০ শতাংশেরও বেশি।
এদিকে ভারতের কিছু বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মাংস বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আর গো-সুরক্ষার কড়াকড়ির কারণে অনেকের মনে হয়েছে, খাদ্যাভ্যাসেও নিয়ন্ত্রণ আনা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ‘মাছ’ বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। যেন ভাতের থালা থেকে মাছ ফসকে গিয়ে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার মানুষের খাবারের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, বিজেপি মানুষকে মাছ, মাংস, এমনকি ডিম খেতেও দেবে না। তার ভাষায়, বাংলা মাছ-ভাত খেয়ে বাঁচে, এটা কোনো আপসের বিষয় না।
বিজেপি এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। দলটির নেতারা বলছেন, এটা মিথ্যা প্রচারণা, দুর্নীতির অভিযোগ থেকে দৃষ্টি সরাতেই এসব বলা হচ্ছে। বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি বলেন, মাছ-ভাত বাংলার সংস্কৃতির অংশ, এটা কেউ বন্ধ করবে না।
অন্যদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উল্টো অভিযোগ করেছেন, তৃণমূল সরকার বাংলাকে মাছ উৎপাদনে স্বনির্ভর করতে পারেনি, এখনো বাইরে থেকে মাছ আনতে হয়। জবাবে মমতা বলেন, রাজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ মাছের চাহিদা স্থানীয়ভাবেই পূরণ হয়।
আসলে, বাংলায় মাছ শুধু খাবার নয়; এটা সংস্কৃতি, পরিচয়, ইতিহাস আর আবেগের অংশ। অধিকাংশ মানুষ নিয়মিত মাছ খায়, আর ইলিশ বা চিংড়ির মতো মাছ নিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আলাদা গুরুত্বও আছে। এই কারণেই মাছ এখন রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে উঠেছে। এক পক্ষ এটাকে খাদ্য ও সংস্কৃতির স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে তুলছে, অন্য পক্ষ এটাকে ব্যবহার করছে সরকারের ব্যর্থতা দেখাতে।
সূত্র: বিবিসি