logo

এখনও বিশ্বকে বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় আন্তর্জাতিক আইন

এখনও বিশ্বকে বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় আন্তর্জাতিক আইন

ধ্বংসযজ্ঞের অন্ধকারের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা (পোস্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ার-টু অর্ডার)। হয়তো এটি সর্বাঙ্গ নিখুঁত নয়, তবে বিশ্বযুদ্ধের ভয়বাহতার অভিজ্ঞার পর মানবজাতিকে আরেকটি বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই এটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। 

১৯৪৩ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি যখন মিত্রশক্তির পক্ষে যেতে শুরু করেছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট সতর্ক করে বলেছিলেন— ‘যদি যুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত শান্তি এই সত্যকে স্বীকার না করে যে, পুরো পৃথিবী আসলে একটি যৌথ প্রতিবেশী এবং সব মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করা হয়, তবে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের বীজ মানবজাতির জন্য স্থায়ী হুমকি হয়ে থাকবে।’

আজ সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তি ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে উঠছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল পরাশক্তিগুলোর সংঘাত প্রতিরোধ করা, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা, যুদ্ধ কমানো এবং আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে মানবাধিকারকে দৃঢ় করা—তা এখন গুরুতর চাপের মুখে রয়েছে।

এই চাপ এসেছে নতুন করে মাথা তোলা চরম জাতীয়তাবাদ, তীব্র কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি, পুরনো জোটগুলোর ভাঙন এবং প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নিয়মকে প্রকাশ্যে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা থেকে।

যেসব বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান একসময় বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করত, সেগুলো এখন ক্রমেই উপেক্ষিত হচ্ছে বা ক্ষমতার রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠছে। মৌলিক আন্তর্জাতিক সমঝোতা বা চুক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে বা সরাসরি লঙ্ঘিত হচ্ছে। আইনের মানার প্রবণতা কমে যাচ্ছে এবং প্রয়োগের প্রক্রিয়াও অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বিশ্ব ধীরে ধীরে এমন এক শক্তিনির্ভর বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ন্যায়ের জায়গা নিচ্ছে শক্তি এবং নীতির জায়গা নিচ্ছে ক্ষমতা।

বিশ্বব্যবস্থা হুট করেই ভেঙে পড়ে না। যাদের ওপর এই ব্যবস্থা রক্ষা করার দায়িত্ব থাকে তারা যদি তা না করে; যখন দৃঢ়তার জায়গা নেয় ভীরুতা, নীতির বদলে আসে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং নৈতিক স্পষ্টতার জায়গায় প্রতিষ্ঠা পায় দ্বৈত মানদণ্ড, তখনই এটি ভেঙে পড়ে। যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দৃঢ়ভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে রক্ষা ও আধুনিকায়নের জন্য এগিয়ে না আসে, এবং এটিকে আরও প্রতিনিধিত্বমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক না করে, তবে বৈশ্বিক ব্যবস্থা আরও অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক ভারসাম্যহীনতার দিকে এগিয়ে যাবে।

যুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি জাতিসংঘ সনদ। তবে এই সনদের বাস্তবায়ন এখন হুমকির মুখে। সনদে বলা হয়েছে, ‘কোনো রাষ্ট্র আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না।’

এই মৌলিক নীতিই আধুনিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু এখন তা দৃশ্যমানভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এখন শক্তি প্রয়োগের হুমকি, এমনকি কোনো আইনি অনুমোদন বা অর্থবহ আলোচনার বাইরে গিয়ে একতরফা সামরিক পদক্ষেপ একটি উদ্বেগজনক নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হতে শুরু করেছে। 

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বহু রাষ্ট্রীয় বিরোধ সফলভাবে নিষ্পত্তি করেছে। এটি দেখিয়েছে, আইনের শক্তি সামরিক শক্তি বা সংঘর্ষের বিকল্প হতে পারে। 

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, যে শক্তিগুলো একসময় এই আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলেছিল, তারাই এখন রাজনৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে এগুলোর ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে।

গত দশকে বিভিন্ন সংঘাতের ক্ষেত্রে বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া এই দ্বিচারিতাকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের সার্বজনীনতার ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করেছে। 

আমাদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—মর্জিমতো বিচার, উদাসীনতা বা নীতিহীন রাজনীতির কারণে যদি আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি ক্ষয়ে যেতে দেওয়া হয়, তবে বিশ্ব আবারও নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার অন্ধকারে ডুবে যাবে। নিয়ন্ত্রণহীন আগ্রাসন, সীমান্ত লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম ভাঙনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বিশ্বব্যবস্থা আমরা মেনে নিতে পারি না।

লেখকদ্বয়
ফাতু বেনসুদা: আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি
সাম সাসান শোআমানেশ: আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কৌঁসুলির সাবেক চিফ অব ক্যাবিনেট

আলজাজিরায় প্রকাশিত “হোয়াই ইন্টারন্যাশনাল ল’ ইজ স্টিল দ্যা ওয়ার্ল্ডস বেস্ট ডিফেন্স” শীর্ষক কলাম থেকে অনূদিত।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]