logo

কেন একটি শূকরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল

কেন একটি শূকরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল

বাড়িতে পোষা কোনো প্রাণী বা মুক্ত কোনো পশুপাখি অনেক সময় কিছু ক্ষয়ক্ষতি করে ফেলে। সেসব নিয়ে হয়তো তাদের রক্ষণাবেক্ষণকারীদের ক্ষতিপূরণও দিতে হয়, কিংবা ব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ। তবে মধ্যযুগে অবলা প্রাণীদের রীতিমতো আদালতে নিয়ে বিচার করা হতো। আর সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তিও পেতে হতো অনেক প্রাণীর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিচার হতো শূকরের।

মধ্যযুগে গৃহপালিত ও বন্যপ্রাণীদের বিচার হওয়ার বহু ঘটনা আদালতের খতিয়ানে লিপিবদ্ধ রয়েছে। শুনতে যতই অবিশ্বাস্য লাগুক, মধ্যযুগে প্রাণীদের নিয়মিতভাবে আদালতে তুলে বিচার করা হতো। খামারের পশু, গৃহপালিত প্রাণী থেকে শুরু করে পোকামাকড়ের ঝাঁক; যে প্রাণীগুলো মানুষের ক্ষতি করত, তাদের দায়ী করা হতো। এর জন্য দুইটি আলাদা ভাগ ছিল—প্রচলিত আদালতের বিচার এবং ধর্মীয় ভিত্তির বিচার। 

প্রচলিত আদালতে নির্দিষ্ট কোনো প্রাণীকে আদালতে নেওয়া হতো। সেই প্রাণীটি যদি কারো মৃত্যুর কারণ হতো, ক্ষয়ক্ষতি করত বা আহত করত; সেটিকে বিচারের মুখোমুখি করা হতো। ধর্মীয় ভিত্তির বিচার সাধারণত বৃহৎ আকারের দুর্যোগকে কেন্দ্র করে হতো। যেমন পোকামাকড়ের ঝাঁকে ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া, কোনো প্রাণীর উপদ্রবে এলাকার ক্ষয়ক্ষতি বা ইঁদুরের উপদ্রবের কারণে রোগ ছড়িয়ে পড়া। 

এ ধরনের বিচারগুলোতে ধর্মকে এমনভাবে ব্যবহার করা হতো, যা সব সময় গির্জার আনুষ্ঠানিক মতের সঙ্গে মিলত না। সেখানে আধ্যাত্মিকতা, জাদুবিদ্যা এবং গির্জার মতবাদ মিশিয়ে নানা আচার-অনুষ্ঠান করা হতো। ওই প্রাণীগুলোকে সমাজচ্যুত ঘোষণা করা, শহরকে পরিশুদ্ধ করা, বা আরও বিভিন্ন শাস্তির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করা হতো যে সমস্যার সমাধান হবে। 

‘দ্য ক্রিমিনাল প্রসিকিউশন অ্যান্ড ক্যাপিটাল পানিশমেনন্ট’ নামের একটি বইয়ে এমন প্রায় ২০০টির মতো বিচারের ঘটনার উল্লেখ আছে। এখান থেকে জানা যায়, ১৪৫৭ সালে ফ্রান্সের স্যাভিনিতে আদালতে বিচার করে একটি শূকরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

কোন কোন প্রাণীর বিচার হতো?
আলাদাভাবে প্রাণীদের বিরুদ্ধে হওয়া অনেক সিভিল মামলায় দেখা যায়, গৃহপালিত পশুই সবচেয়ে বেশি বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ষাঁড়, ঘোড়া, গরু ও শূকর। সবচেয়ে বেশি বিচার শূকরেরই হতো। মানুষকে আঘাত করা বা মৃত্যুর কারণ হিসেবে অভিযুক্ত প্রাণীকে আদালতে হাজির রাখা হতো বা অন্তত প্রদর্শন করা হতো। 

অন্যদিকে, পঙ্গপাল বা ইঁদুরের মতো প্রাণীকেও বিচারে নিয়ে আসা হতো, তবে সেগুলো ছিল অনেকটাই আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনের মতো। মানুষকে আঘাত বা হত্যা করা প্রাণীদের মতো তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো কার্যকর শাস্তি দেওয়া সম্ভব ছিল না। এসব প্রাণীর পক্ষেও আইনজীবী নিয়োগ করা হতো, যাতে বিচার প্রক্রিয়া ‘ন্যায়সঙ্গতভাবে’ সম্পন্ন হয়।

কীভাবে হয়েছিল বিচার?
এটি ১৪৫৭ সালের ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। একটি মাদি শূকর এবং তার ছয়টি বাচ্চাকে ফ্রান্সের স্যাভিনির আদালতে তোলা হয়েছিল। সেগুলোর ’হিংস্র’ আচরণের জন্য একটি শিশুর মৃত্যু ঘটে। এ জন্য ওই শূকরের যিনি মালিক ছিলেন, তার বিরুদ্ধেও অবহেলার অভিযোগ আনা হয়। 

আদালতের রায়ে বাচ্চা শূকরগুলোকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও মাদি শূকরটিকে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সে সময় মানুষের ক্ষেত্রে শিরশ্ছেদ, ফাঁসি, পুড়িয়ে মারার শাস্তি ছিল; অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটত না। 

মধ্যযুগে শূকর কী প্রতীক বহন করত?
মধ্যযুগে শূকর ছিল সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য মাংসের উৎস। পশ্চিম ইউরোপে বন্য শূকর শিকার করা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। হরিণের মতো প্রাণীর শিকার বা মাংসে ছিল উচ্চবিত্তদের নিয়ন্ত্রণ। সে সময়ের গৃহপালিত শূকর আজকের মতো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত ছিল না, তাই দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটত। 

মাংসের উৎস হওয়ার বাইরেও আরও বিভিন্ন বিষয়ে শূকরের ব্যবহার ছিল। বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা বা ওষুধের ক্ষেত্রে—ত্বকের রোগ, পেটের সমস্যা এবং বাতের ব্যথার মতো নানা অসুখের জন্য শূকরের শরীরের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হতো। এ ছাড়া শূকরকে সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবেও দেখা হতো। সেখান থেকেই পরবর্তীতে ‘পিগি ব্যাংক’ বা আমাদের পরিচিত মাটির ব্যাংকের শুরু।