অবশেষে রাফাহ ক্রসিং খুলছে আজ

টানা দুই বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে গাজা ও মিশরের মধ্যকার রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দখলদার ইসরায়েল। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সীমিত পরিসরে ‘পাইলট পর্যায়ে’ এই সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। ইসরায়েল বলছে, হাজার হাজার অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনি বিদেশে জরুরি চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের চিকিৎসা সুযোগ দিতে ক্রসিং খুলে দেওয়া হবে।
গাজায় সহায়তা কার্যক্রম তদারককারী ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা সিওজিএটি রোববার জানায়, পায়ে হেঁটে যাতায়াতের জন্য উভয় দিকেই রাফাহ ক্রসিং খুলে দেওয়া হবে। এই কার্যক্রম মিশর ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, ‘আজ ক্রসিংয়ের কার্যক্রম পরীক্ষা ও মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে একটি পাইলট অপারেশন চালানো হচ্ছে। আগামীকাল থেকে গাজায় প্রবেশ ও প্রস্থান উভয় দিকেই বাসিন্দাদের চলাচল শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা একটি বিশেষ কমপ্লেক্স সম্পন্ন করেছে, যা রাফাহ ক্রসিং দিয়ে যাতায়াতকারী ফিলিস্তিনিদের স্ক্রিনিং সুবিধা হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
রাফাহ হলো গাজার একমাত্র সীমান্ত ক্রসিং, যা ইসরায়েলের অধিকৃত ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। যুদ্ধের আগে এটি ফিলিস্তিনি ও মিশরীয় কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পরিচালনা করত, যদিও ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা হতো। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে গাজায় চলমান গণহত্যামূলক যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বাহিনী ক্রসিংটি দখল করার পর থেকে প্রায় দুই বছর ধরে এটি কার্যত বন্ধ রয়েছে।
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ বলেন, ক্রসিং পুনরায় চালু হওয়া এক ধরনের ‘অস্বস্তিকর বাস্তবতা’ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনিরা যেতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে তারা আশঙ্কা করছে তারা আদৌ ফিরে আসতে পারবে কি না। অনেকেই বলেছেন, তাদের যাওয়ার উদ্দেশ্য কেবল চিকিৎসা গ্রহণ বা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, এবং তারা পরে ফিরে আসতে চান।’
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা আল-জাজিরাকে জানান, যুদ্ধের সময় গাজা ছেড়ে যাওয়া প্রায় ৮০ হাজার ফিলিস্তিনি এখন ফিরে আসতে চান। একই সঙ্গে প্রায় ২২ হাজার আহত ও অসুস্থ মানুষের জন্য বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া ‘অত্যন্ত জরুরি’ হয়ে পড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দুইজন মিশরীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, রোববার অন্তত ৫০ ফিলিস্তিনি রোগীকে চিকিৎসার জন্য মিশরে প্রবেশের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। প্রথম কয়েক দিনে প্রতিদিন প্রায় ২০০ জন রোগী ও তাদের স্বজনরা এই ক্রসিং দিয়ে মিশরে প্রবেশ করবেন। এর মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন গাজায় ফিরে আসবেন।
রয়টার্স জানায়, মিশর যেসব ফিলিস্তিনির নামের তালিকা পাঠিয়েছে, ইসরায়েল তা অনুমোদন করেছে। এএফপির ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সীমান্তের মিশরীয় অংশে অ্যাম্বুলেন্সগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে, চিকিৎসা সরিয়ে নেওয়া রোগীদের গ্রহণের প্রস্তুতিতে।
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে অপেক্ষমাণদের মধ্যে রয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী আবেদ এল হালিম আবো আসকার। তিনি চার বছর ধরে ক্যান্সারে ভুগছেন। ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর তার অস্ত্রোপচারের কথা ছিল, কিন্তু তার কয়েক দিন আগেই যুদ্ধ শুরু হওয়ায় চিকিৎসা স্থগিত হয়ে যায়।
যুদ্ধের প্রথম মাসেই গাজা সিটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আবো আসকারের ২৮ বছর বয়সী মেয়ে শাইমা তার স্বামী ও দুই সন্তানসহ নিহত হন।
তার ছেলে আহমেদ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমার বাবা দুই বছর চার মাস ধরে অপেক্ষা করছেন। এখন তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার আশা খুবই ক্ষীণ। প্রতিদিন বলা হয় ক্রসিং খুলবে, ধৈর্য ধরো। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কিছুই বদলায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবার অস্ত্রোপচার দরকার, কিন্তু আমরা জানি না কী করব। ওষুধ একেবারেই নেই, পরীক্ষা করার মতো সুযোগও নেই। কারণ ইসরায়েল প্রায় সব হাসপাতাল ধ্বংস করে দিয়েছে।’