logo

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে চড়া সারের দাম, প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বিগ্ন

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে চড়া সারের দাম, প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বিগ্ন

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন সারের বাজারে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সারের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি এবং অপর্যাপ্ত সরবরাহে গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন দেশটির হাজার হাজার কৃষক।

টেনেসি অঙ্গরাজ্যের গিবসন কাউন্টির কৃষক টড লিটলটন। তিনি সয়াবিন ও গম চাষ করেন। সারের দাম বাড়ার কারণে এ বছর তার উৎপাদন খরচ গত বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বা প্রায় ১ লাখ ডলার বেড়েছে। টানা কয়েক বছরের আর্থিক লোকসান কাটিয়ে ওঠার আগেই এই বাড়তি খরচের বোঝা তাকে এবং তার মতো বহু কৃষককে দিশেহারা করে তুলেছে।

বুধবার (১৮ মার্চ) বার্তা সংস্থা এপি-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের বরাতে সংবাদমাধ্যম আরব নিউজ জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি আরব উপসাগর থেকে নাইট্রোজেন সার রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে।

আমেরিকান ফার্ম ব্যুরো ফেডারেশনের (এএফবিএফ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট সার আমদানির ১৫ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশ্বের মোট ইউরিয়া সরবরাহের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রিত হয় এই অঞ্চল থেকে। এ ছাড়া বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ অ্যামোনিয়া উৎপাদন হয় মধ্যপ্রাচ্যে।

লিটলটন বলেন, যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচলের আশঙ্কায় বন্দরগুলো যখন নাইট্রোজেনের দাম বাড়িয়ে দিল, তখন এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি আমাদের খামারে। এই বাড়তি খরচ বহন করা খুবই কঠিন, কারণ গত কয়েক বছর ধরে ফসলের দাম কম থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা সংকটে রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ফসল ভুট্টা উৎপাদনে নাইট্রোজেনভিত্তিক সার অপরিহার্য। এই ভুট্টা একদিকে গবাদি পশুর প্রধান খাদ্য, অন্যদিকে এটি থেকে উৎপাদিত জ্বালানি দিয়ে সে দেশের সিংহভাগ যানবাহন চলাচল করে। ফলে সারের এই আকাশচুম্বী দাম কেবল কৃষিখাতেই নয়, বরং সামগ্রিক খাদ্য ও জ্বালানি ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কৃষকের সার পাওয়া নিয়ে ধোঁয়াশা

পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, কেবল চড়া দাম নয়, অনেক ক্ষেত্রে অর্থ দিয়েও সার পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এএফবিএফ-এর প্রেসিডেন্ট জিপি ডুভল এই উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছেন।

জিপি ডুভল সতর্কসংকেত দিয়ে বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। যেসব কৃষক আগে থেকে সারের অর্ডার দেননি বা অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করেননি, তারা চলতি মৌসুমে বা বসন্তকালীন ফসল রোপণের জন্য প্রয়োজনীয় সার একেবারেই না-ও পেতে পারেন।

সাউথ ক্যারোলাইনা ফার্ম ব্যুরোর প্রধান এবং অভিজ্ঞ কৃষক হ্যারি ওট জানান, আগামী কয়েক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সার বর্তমানে গুদামগুলোতে মজুত নেই। বিশেষ করে তুলা, ভুট্টা ও চীনাবাদামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের আবাদ নিয়ে কৃষকরা চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

তিনি বর্তমান অবস্থাকে কৃষকদের জন্য ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মূলত বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবেই এই নজিরবিহীন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, যা মার্কিন কৃষিখাতকে এক বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

যুদ্ধের অবসান হলেও দাম কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে মূলত কাঁচামাল সংকট ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উচ্চমূল্য এবং চীনের ফসফেট রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ার ফলে বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছিল। ইরান যুদ্ধ এ পরিস্থিতিকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে। সারের বাজারে এই অস্থিরতা সহসা দূর হচ্ছে না বলে সতর্ক করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। 

কৃষি ঋণদাতা সংস্থা কো-ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জ্যাকুই ফাটকা জানান, যদি আজই ইরান যুদ্ধের সমাধান হয়ে যায়, তবুও সারের দাম দ্রুত কমবে না। সরবরাহ চেইন পুনরায় সচল করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সারবাহী জাহাজ পৌঁছাতে ৩০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মজুত দিয়ে সাময়িকভাবে কাজ চললেও, তা ফুরিয়ে এলে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নাইট্রোজেন ও ফসফেট সার অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত হলেও এর সুফল খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান ভিলামিলের মতে, সার উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপাদানের খরচ বা এনার্জি কস্ট বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় সারের দামও চড়া থাকছে। ফলে কৃষকদের পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা ছাড়া উপায় নেই।

আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক চ্যাড হার্ট বলেন, তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার ফলে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়তে পারে। কারণ, মুদি দোকানে পণ্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেলের খরচ এবং প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।

তবে, সারের বর্ধিত দাম কৃষকদের মুনাফায় টান ফেললেও তা মুদি দোকানের পণ্যের দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলা উচিত নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এর কারণ হলো, সুপারমার্কেটে ভোক্তারা যা প্রদান করেন তার খুব সামান্য অংশই খামারের উৎপাদন খরচের সাথে যুক্ত।

কৃষকদের বাঁচাতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ক্রমবর্ধমান সারের দাম ও সরবরাহ সংকট থেকে কৃষকদের সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে ভেনেজুয়েলা থেকে সার আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মার্কিন কৃষিমন্ত্রী ব্রুক রোলিন্স এই পদক্ষেপকে ‘কৃষক ও কৃষি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বড় প্রমাণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) জানিয়েছে, শুল্কসংক্রান্ত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইতোমধ্যে কৃষকদের ১২ বিলিয়ন ডলারের এককালীন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত কৃষকদের অতিরিক্ত ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আর্থিক সাহায্য প্রদান করা হয়েছে। বাজার ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে সারের দাম কমিয়ে আনাই সরকারের মূল লক্ষ্য।

সরকারি সহায়তা সত্ত্বেও উদ্বেগের কারণ রয়ে যাচ্ছে। কো-ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জ্যাকুই ফাটকা জানান, প্রতি একর ভুট্টা চাষে ৪৪ ডলারের সহায়তা অত্যন্ত সামান্য। কারণ বর্তমানে একজন কৃষকের প্রতি একরে গড় উৎপাদন খরচ প্রায় ৯০০ ডলার। কানসাস সিটির বড় মাপের কৃষক টম ওয়াটার্স জানান, উৎপাদন খরচ বাড়লেও ফসলের দাম কম থাকায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। খরচ কমিয়ে মিতব্যয়ী হয়েই তাদের এখন আবাদ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

চরম আর্থিক চাপের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে খামার দেউলিয়া হওয়ার হার বেশ কম। গত বছর ১ দশমিক ৯ মিলিয়ন খামারের মধ্যে মাত্র ৩১৫টি দেউলিয়া হওয়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে। এ ছাড়া বাজারে ভুট্টা ও সয়াবিনের দাম সাম্প্রতিক সময়ে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় কৃষকরা কিছুটা আশার আলো দেখছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে কৃষি খামারের ছোট হয়ে আসা মুনাফা এখন বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।