আলোচনার টেবিলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, কী সিদ্ধান্ত নিল দুই দেশ?

পারমাণবিক ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে প্রথম দফায় হওয়া ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ওমানের মধ্যস্থতায় রাজধানী মাস্কাটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিদল পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নেয়। রাতে ট্রাম্প বলেন, ‘মনে হচ্ছে ইরান চুক্তি করতে আগ্রহী। তবে আমাদেরও দেখতে হবে চুক্তির শর্ত কী হবে।’
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে হামলা চালায়। এর প্রায় আট মাসের মাথায় উপসাগরীয় আরব দেশটিতে শুক্রবার দুপক্ষই বৈঠকে বসেছিল। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর এটি দুই দেশের প্রথম দফার আলোচনা। উভয় দেশ তাদের রাজধানীর সঙ্গে পরামর্শের পর আরও আলোচনা চালাতে সম্মত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি ইরান আলোচনার টেবিলে না বসলে আবারও হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে বা পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর আঘাত করতে পারে।
ওয়াশিংটনের হুমকি-ধমকির পর অবশেষে ট্রাম্পের ‘ইচ্ছে অনুযায়ী’ আলোচনায় বসল তেহরান। আলোচনার আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, তার দেশ ‘খোলা চোখ এবং গত বছরের স্মৃতি মনে রেখেই কূটনীতিতে প্রবেশ করছে।’ তিনি এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘আমরা সৎ বিশ্বাসে নিয়োজিত এবং আমাদের অধিকারের প্রতি অটল।’
তবুও, উভয় দেশের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ‘খুব চিন্তিত হওয়া উচিত,’ যদিও উভয় পক্ষই আলোচনার জন্য প্রস্তুত। শুক্রবার ট্রাম্প আরও বলেন, আলোচনা ফলপ্রসূ হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘বড় নৌবহর’ ইরানের দিকে পাঠানো হচ্ছে এবং শিগগিরই পৌঁছাবে।
কারা জড়িত
পরোক্ষ এই আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, তার সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক বিষয়ক সহকারী মজিদ তখত-রাভানচি, মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই, অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক হামিদ ঘানবারি এবং অন্য ইরানি কূটনীতিকরা।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা ও অনানুষ্ঠানিক সহকারী জ্যারেড কুশনার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতে, মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারও আলোচনায় অংশ নেন। তবে তার অংশ নেওয়া ভালোভাবে নেয়নি ইরানিরা।
আলোচনায় মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি। গত বছর জুনের ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের আগে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পাঁচ দফা আলোচনাতেও মধ্যস্থতা করে ওমান। সেসময়ও পরোক্ষ আলোচনা হয়েছিল। তবে আলোচনায় কোনো উন্নতি না হওয়ায় ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সেবারের মতো ভেস্তে যায় সব প্রচেষ্টা।
কী আলোচনা হলো
ইরানি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, আব্বাস আরাঘচি ওমানের মাধ্যমে একটি ‘প্রাথমিক পরিকল্পনা’ উপস্থাপন করেছেন। এর লক্ষ্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘চলমান পরিস্থিতি পরিচালনা’ করা। মধ্যস্থতার ভূমিকা পালনকারী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি এই পরিকল্পনাটি মার্কিন প্রতিনিধিদলের কাছে পৌঁছে দেন। আলোচনার সময় দুই পক্ষের প্রতিক্রিয়া বিনিময় করা হয়।
বৈঠকের পরিধি সীমিত ছিল। ইরানের পক্ষ থেকে কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হয়, যেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, প্রক্সি বাহিনী এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মতো বিষয় বাইরে রাখা হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল আলোচনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সশস্ত্র প্রক্সি এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমন সম্পর্কিত বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হোক।
মুখ্য বিতর্কের বিষয় ছিল ইরানের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এটি প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ এটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে। ইরান প্রস্তাব দিয়েছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উপর নজরদারি হবে, যাতে এটি অস্ত্র উৎপাদনের জন্য ব্যবহার না হয় এবং বিনিময়ে তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি করছে।
আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখবে। শুক্রবার তারা ইরানি তেল এবং ১৪টি জাহাজে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের উপ-মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, ‘ইরানি সরকার বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন অব্যাহত রেখেছে এবং দেশের ভেতরে দমন-পীড়ন বাড়িয়েছে। তাদের উচিত জনগণ ও ভাঙাচোরা অবকাঠামোর কল্যাণে বিনিয়োগ করা।’
ঝুঁকিতে কী
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার ফলে আরব উপসাগরে পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে করে যুদ্ধের সম্ভাবনা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমেরিকার একটি ‘আরমাডা’ (নৌবহর) ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। যদিও তিনি ‘কিছু ঘটতে দেখতে চান না’ বলে জানিয়েছিলেন। ট্রাম্প জানান, তার প্রশাসন ইরানকে ‘খুব নিবিড়ভাবে’ পর্যবেক্ষণ করছে। এই আলোচনার ফলে আশা জাগিয়েছিল, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানো যেতে পারে। তবে, গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প বলেছেন, শিগগিরই একটি ‘বড় নৌবহর’ এই অঞ্চলে আসবে।
আঞ্চলিক দেশগুলো উত্তেজনা কমাতে ও ট্রাম্পকে ইরানের উপর আক্রমণ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে তুরস্ক এ জন্য বেশি তৎপর বলে মনে হচ্ছে। গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে উঠছিল তখন আঙ্কারা মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। যদিও আঙ্কারার আগ্রহে প্রতিক্রিয়া দেখায়নি কোনো পক্ষই। তুরস্ক মনে করে, ইরানের সঙ্গে মার্কিন সংঘাত এই অঞ্চলকে ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।
সম্প্রতি এক ভাষণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি জড়ো করে ইরানের ওপর হামলা চালান, তাহলে তা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের হাতে অনেক হাতিয়ার রয়েছে। ধারণা করা হয়, তাদের কাছে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা এবং সম্পদকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে। গত বছর মার্কিন হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক স্থাপনা আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করে তেহরান।
ইরান এই অঞ্চলজুড়ে বিশাল প্রক্সি নেটওয়ার্ক তৈরি করে রেখেছে। ফলে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হয়। এটি বিশ্বজুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করতে পারে।