দায়িত্ব পেলে দুই বছরে বদলে যাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি, ঘোষণা প্রশাসকের

মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে রাজধানীর বর্তমান চিত্র পরিবর্তন করবেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম।
শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর সিরডাপ ভবনে নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম আয়োজিত ‘ঢাকায় বৃষ্টি ভোগায় কেন!’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা জানান।
ডিএসসিসি প্রশাসক জানান, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে রাজধানীর বর্তমান চিত্র পরিবর্তন করে একে একটি মানসম্পন্ন ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করবেন। এ জন্য রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্য ও সমষ্টিগত নাগরিক প্রয়াসের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই ঢাকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত, আবর্জনা-গন্ধময় ও মশার শহর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। জনগণ যদি ৫০ শতাংশ এবং সরকার বা সিটি কর্পোরেশন যদি বাকি ৫০ শতাংশ দায়িত্ব পালন করে, তবে ১০০ শতাংশ সফল হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।’
এ সময় তিনি অতীত ইতিহাসের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘৭৫-এর আগে দেশ এক মহাসংকট ও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নির্দেশনায় দেশ অতি দ্রুত সেই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ায়, এমনকি বিদেশে চাল রপ্তানিও করেছিল। বর্তমানের জাতীয় সমস্যাগুলোও সঠিক লিডারশিপ ও সমষ্টিগত ঐক্যের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।’
মশা নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে জরিপ শুরু
সেমিনারে মশার উপদ্রবকে ঢাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা উল্লেখ করে প্রশাসক জানান, যথাযথ পদক্ষেপ নিলে মশা ৬৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর ৯৯ শতাংশ মশার জন্ম হয় মূলত ওয়াটার লগিং বা জলাবদ্ধতা থেকে। এটি দূর করতে পারলে ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে বাঁচা সম্ভব।
তিনি জানান, ঢাকা দক্ষিণে প্রথমবারের মতো প্রাক-বর্ষা মশার লার্ভা নিধনের জন্য বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর আওতায় ৩৬ জন মাঠকর্মী প্রতিদিন প্রতিটি ওয়ার্ডের বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ চালাচ্ছেন। মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি থেকে লার্ভার নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগেভাগেই চিহ্নিত করা হবে।
নাগরিক অসচেতনতার একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে আবদুস সালাম বলেন, ‘জরিপ শুরুর প্রথম দিন আমি নিজেই নগর ভবনের পাশের পশু হাসপাতালে হেঁটে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি দুই দিন আগের বৃষ্টির পানি জমে থাকা একটি ভাঙা কক্সি ও পরিত্যক্ত পাতিলে অসংখ্য লার্ভা জন্মেছে। লার্ভা থাকা অবস্থায় ধ্বংস না করলে তা মশা হয়ে আমাদেরই কামড়াবে। অথচ ঘরের কোণে, ছাদ-বাগানে বা ফ্রিজের জমানো পানিতে মশা উৎপাদন করে মানুষ দায় চাপায় সিটি কর্পোরেশনের ওপর।’
জলাবদ্ধতা নিরসনে মাস্টারপ্ল্যান ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা
রাজধানীর জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাকৃতিক খাল-পুকুর ভরাটকে দায়ী করেন প্রশাসক। ধোলাইখালের মতো ঐতিহ্যবাহী বড় খালকে বক্স কালভার্ট বা ‘রাবার ড্রেন’ করার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর যেকোনো বড় শহরের ভেতরেই উন্মুক্ত নদী বা প্রবাহিত খাল থাকে, যা বৃষ্টির পানি সহজে নামিয়ে দেয়। কিন্তু ঢাকায় সেই ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে ওঠেনি। যেখানে অন্তত সাত-আটটি প্রধান ড্রেনেজ চ্যানেল থাকা দরকার, সেখানে আছে মাত্র দুটি বা তিনটি।’
তিনি আরও জানান, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি বা এলিফ্যান্ট রোডের পানি পাম্প করে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ফেলা স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। এই পানি চূড়ান্তভাবে বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যায় নিয়ে যেতে হবে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কাজ শুরু না করলে পরবর্তী বর্ষাগুলোতে সুফল পাওয়া যাবে না।
রিক্সা ও হকার নিয়ন্ত্রণে কঠোর নিবন্ধন
৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিক্সা এবং হকারদের সংখ্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে উল্লেখ করে প্রশাসক বলেন, ‘নদীভাঙা বা কর্মহীন মানুষ ঢাকা শহরে এসেই কোনো লাইসেন্স বা ফি ছাড়াই রিক্সা নিয়ে নেমে পড়ছে। এভাবে একটি আন্তর্জাতিক মানের শহর চলতে পারে না।’
তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এখন থেকে ঢাকা শহরে কোনো হকার বা রিক্সা নিবন্ধনের (রেজিস্ট্রেশন) বাইরে থাকতে পারবে না। সদরঘাটে বা এলিফ্যান্ট রোডে ঠিক কতজন হকার বসতে পারবেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিধি নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর ব্যাপারেও পরিকল্পনা চলছে। তবে এই শৃঙ্খলা ফেরাতে গিয়ে যদি কেউ আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা করতে চায়, তা বরদাশত করা হবে না এবং এ বিষয়ে তিনি জনগণের সমর্থন প্রত্যাশা করেন।
বর্তমান সরকারকে সময় দেওয়ার আহ্বান
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ‘গত জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের পর তিন মাস হলো একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এখনই এই সরকারকে ফেলে দেওয়ার বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য মানুষকে ম্যান্ডেট বা সময় দিতে হবে। অন্তত দুই-তিন বছর সময় দিয়ে দেখুন তারা জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারছে কি না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও ঢাকার শৃঙ্খলা ফেরাতে সব রাজনৈতিক দলকে পজিটিভ চিন্তা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।’
.png)






