৭ হাজার কোটির যন্ত্র চলে ৫ ঘণ্টা
• দুপুর হলেই জনশূন্য হাসপাতাল
• চিকিৎসা করাতে গিয়ে শেষ সম্বলও বিকিয়ে দিতে হচ্ছে
• ১৯ ঘণ্টা তালাবদ্ধ, নিয়মিত সেবা পান ২৫ শতাংশ রোগী
• ৫১৩ হাসপাতাল চলছে ৪ হাজার টেকনোলজিস্টে
• ৭৫ ভাগ রোগীকে ছুটতে হয় বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে
• এক বছরে একবারের জন্যও ব্যবহার হয়নি ৫২ শতাংশ যন্ত্রপাতি
• উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ৭ হাজার ৯২ কোটি টাকার যন্ত্র
• জনবল বাড়িয়ে দুই শিফটে সেবা চালুর পরিকল্পনা সরকারের
• বাংলাদেশ ছাড়া দুনিয়ার কোনো হাসপাতাল এভাবে চলে না: ডা. রশিদ-ই মাহবুব

দেশের পাঁচ শতাধিক সরকারি হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত—এ চার শ্রেণির হাসপাতালে প্রায় ৭ হাজার ৯২ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি রয়েছে। তবে এর সুফল পুরোটা পাচ্ছেন না সাধারণ রোগীরা। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এসব দামি যন্ত্রপাতি সচল থাকে মাত্র ৫ ঘণ্টা। সকাল ৮টায় শুরু হয়ে দুপুর ১টায় বন্ধ হয়ে যায় ল্যাব ও নমুনা পরীক্ষার ক্যাশ কাউন্টার। ফলে বিকেলেই তালা ঝুলতে থাকে ল্যাবরেটরিগুলোতে।
সরকারি যন্ত্রপাতি অলস পড়ে থাকার মাশুল সাধারণ রোগীরা দিলেও পকেট ভরছে দালালচক্র আর বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। এতে যন্ত্রপাতি পড়ে থেকে যেমন সক্ষমতা হারাচ্ছে, আবার চিকিৎসা কিনতে গিয়ে ফতুর হচ্ছেন রোগী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য সেবা খাতের মতো স্বাস্থ্যসেবাকে এক করায় মূলত এই সংকট। এমনকি সরকারি অন্যান্য দপ্তরে বিকেল পর্যন্ত সেবা কার্যক্রম চললেও চিকিৎসার জন্য সেবাকে একেবারে সীমিত করা হয়েছে। এমন বেহাল দশার কারণে দেশের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে বেসরকারিতে চিকিৎসা কিনতে গিয়ে সঞ্চয় হারাচ্ছে, দারিদ্র্য বাড়ছে। প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বেসরকারির মতো ২৪ ঘণ্টা সরকারি হাসপাতালের ল্যাবগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এমন অবস্থার পেছনে জনবল সংকট প্রধান সমস্যা বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী একজন ডাক্তারের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকার কথা, কিন্তু আমরা এর থেকে অনেক পিছিয়ে। যত ডাক্তার, তত নার্স ও প্যারামেডিকস রয়েছে। ফলে সেবার গতি বাড়ছে না। এখানে সিস্টেমের ঘাটতি রয়েছে। তবে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। দ্রুত চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের কাজ চলছে।’
১৯ ঘণ্টা তালাবদ্ধ ৭ হাজার কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে অবকাঠামোগত স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ১৬ হাজারের মতো। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৬ শতাধিক হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা আছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীনে রয়েছে ৫১৩টি হাসপাতাল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৪২৬টি উপজেলায় এক্সরে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ইউরিন অ্যানালাইজারের মতো প্যাথলজি, অপারেশন থিয়েটার, ব্ল্যাড ব্যাংক এবং ওয়ার্ডে সাধারণ যন্ত্র থাকে। সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৪০ ধরনের জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র থাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সব মিলিয়ে অন্তত ২ কোটি টাকার যন্ত্র থাকে প্রান্তিক পর্যায়ের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র উপজেলা হাসপাতালে। সে অনুযায়ী ৪২৬টি উপজেলা হাসপাতালে রয়েছে ৮৫২ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি।
অন্যদিকে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে অন্তত ২০ কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি রয়েছে। সে অনুযায়ী ৬২টি হাসপাতালে ১ হাজার ২৪০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি রয়েছে।
অধিদপ্তরের সূত্র আরও বলছে, উপজেলা ও জেলা সদর হাসপাতালের অধিকাংশ রোগীকে উন্নত চিকিৎসায় ছুটতে হয় বিভাগীয় হাসপাতালে। যেখানে সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ভেন্টিলেটরসহ অ্যানেসথেসিয়া, অক্সিজেন গ্যাস পাইপলাইন, কার্ডিয়াক ইউনিট, ডায়ালাইসিস সেন্টার, আইসিইউ ইউনিট, ইকো, ল্যাপারেস্কোপিসহ ছোট-বড় প্রায় ২০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকে একটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সে অনুযায়ী আটটি বিভাগীয় হাসপাতালে রয়েছে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি।
এ ছাড়া ক্যানসার, কিডনি, অর্থপেডিক, হৃদরোগ, বক্ষব্যাধিসহ দেশে ১৭টি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। সেখানেও অন্তত ২০০ কোটি টাকার জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র রয়েছে। এসব হাসপাতালে রয়েছে ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকার যন্ত্র। সব মিলিয়ে ৫১৩টি হাসপাতালে সাত হাজার ৯২ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি রয়েছে।
তবে হাজার হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতির এসব হাসপাতাল সকাল সাড়ে ৮টার পর থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পরীক্ষার সুযোগ পান রোগীরা। এর মধ্যে বিভাগীয় মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে ও রাজধানীর যেসব হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি অ্যান্ড ক্যাজুয়ালটি সার্ভিস (ওসেক) চালু রয়েছে, সেখানে রাত ৮টা পর্যন্ত কয়েকটি পরীক্ষা (সিবিসি, ব্লাড সুগার, ইউরিন আরই, এক্সরে) চালু থাকে।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদ্য সাবেক লাইন ডিরেক্টর ডা. জয়নাল আবেদীন টিটো এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং নিরবচ্ছিন্ন বাজেটপ্রবাহ—এই চারটি বিষয়কে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন স্পেশালাইজড হাসপাতালগুলোতে উন্নত অবকাঠামো থাকলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো এখনও ২০ থেকে ৪০ বছর পুরোনো কাঠামো দিয়ে চলছে। ফলে বর্তমান সময়ে মানসম্মত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
রোগ নির্ণয় ও জরুরি চিকিৎসায় মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকের মূল কাজের আগেই রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা আবশ্যক। মধ্যরাতে কোনো রোগী তীব্র বুক ব্যথা বা জটিল সমস্যা নিয়ে আসলে রক্তের জরুরি পরীক্ষা (যেমন কার্ডিয়াক এনজাইম বা ইলেকট্রোলাইট) করা ছাড়া সঠিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। টেকনোলজিস্টের অভাবে ধারণার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দিলে রোগীর যথাযথ উন্নতি নাও হতে পারে।’
তিনি আরও পরামর্শ দেন, জনস্বার্থে প্রয়োজনে সেবামূল্যের বিনিময়ে হলেও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও মাইক্রোবায়োলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া উচিত, যাতে রোগীরা বাইরের বেসরকারি ল্যাবে গিয়ে হয়রানির শিকার না হন এবং সরকারি হাসপাতালেই ২৪ ঘণ্টা সেবা পান।
হাসপাতালের অচল যন্ত্রপাতি দ্রুত সচল করার ওপর জোর দিয়ে সাবেক এই কর্মকর্তা ইলেকট্রো-মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে জনবল নিয়োগের তাগিদ দেন। ডা. জয়নাল বলেন, ‘একটি যন্ত্র নষ্ট হলে সরকারি জটিল প্রক্রিয়ার কারণে তা মেরামত করতে দুই-তিন বছর লেগে যায়। অথচ বেসরকারি হাসপাতালে নষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা ঠিক করা হয়। এ জটিলতা কাটাতে সারা বিশ্বের মতো দেশেও ‘ইলেকট্রো-মেডিকেল টেকনোলজিস্ট’ নিয়োগ দিয়ে অবিলম্বে মেরামত প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুতগামী করা প্রয়োজন।’
দুপুর হলেই জনশূন্য হাসপাতাল
কোমরে দীর্ঘদিনের হিপ জয়েন্টের ব্যথা নিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) যাওয়া-আসার মধ্যে রয়েছেন সৈয়দ মো. হাসান পলাশ। ৫৪ বছর বয়সি মিরপুরের এই বাসিন্দার চিকিৎসা নিতে দুপুর ১২টায় হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট কেটে এক ঘণ্টার চেষ্টায় ডাক্তার দেখাতে পারলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পরের দিন আসতে বলা হয়েছে তাকে। কারণ, রেডিও অ্যান্ড ইমাজিন বিভাগের রোগ নির্ণয়ের সঙ্গে জড়িতরা বেরিয়ে গেছেন। তালা ঝুলছে রোগ নির্ণয় কক্ষে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) হাসপাতালের বহির্বিভাগে কথা হয় হাসান পলাশের সঙ্গে। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, সময়মতো হাসপাতালে এসে ডাক্তার দেখাতে পারলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে পারিনি। এমনকি দুপুর ১টা বাজলেই ডাক্তাররা চলে যান। অথচ ল্যাব ২৪ ঘণ্টা চলার কথা। বেসরকারি হাসপাতালের মতো ২৪ ঘণ্টাকে তিন ভাগে ভাগ করে পর্যাপ্ত জনবল দিলে সরকারি হাসপাতালের সেবার মান অনেক বেড়ে যেত। সেবাদানকারীরাও ঠিকভাবে সেবা দিত, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে ভালো আচরণ করত। রোগীরা বেসরকারিমুখী হতো না, পঙ্গু (নিটোর) হাসপাতালেই আসত। কিন্ডারগার্টেনের মতো গজানো বেসরকারি হাসপাতালের আমাদের প্রয়োজন হতো না।
হাসপাতালটিতে দুপুর ১২টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে রোগীদের তীব্র ভিড়। দুপুর ঘনিয়ে আসতেই চিকিৎসকদের কক্ষে রোগীদের দ্রুত যাওয়া-আসা। রোগীদের কথা না শুনেই ব্যবস্থাপত্র হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন চিকিৎসক। দুপুর ১টার বাজতেই কক্ষের সামনে রোগীদের জটলা কমে আসে, সোয়া ১টা বাজতেই উধাও চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট, কর্মচারীরা।
এ সময় নাম প্রকাশে একজন সার্জন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকারের যেভাবে নিয়ম করেছে, সেভাবেই চলছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এ হাসপাতালে রোগী আসে। চিকিৎসা মানে তো শুধু ডাক্তার দেখানো নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা অবধারিত, কিন্তু সেখানেই জটিলতা বেঁধে যায়। বহু রোগী কোনোভাবে ডাক্তার দেখাতে পারলেও সিস্টেমের কারণে বাইরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এ দায় চিকিৎসকদের নয়। রাষ্ট্র যদি উদ্যোগ না নেয়, হাজার কোটি টাকার যন্ত্র যেভাবে কাজে আসছে না, ভবিষ্যতেও আসবে না।’
নিটোরের এই চিত্র দেশের সব সরকারি হাসপাতালেই। পাশের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়েও একই দৃশ্য দেখা যায়।
শুধু হাসপাতাল নয়, একই এলাকায় রয়েছে দেশের সরকারিভাবে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য প্যাথলজিক্যাল ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্র ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে গিয়ে দেখা যায় সুনসান নীরবতা।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দৈনিক ৮ হাজারের মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে এ ল্যাবরেটরির। এর মধ্যে সিবিসি পরীক্ষাই করা যাবে পাঁচ হাজার। কিন্তু দৈনিক পরীক্ষা হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০টি। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সমানসংখ্যক টোকেন দেওয়া হয়। টোকেন শেষ হলেই আর দেওয়া হয় না। ফলে কখনও দুপুর সাড়ে ১২টার কখনও ১টার আগেই বন্ধ হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির একজন হেমাটোলজিস্ট জানান, ‘ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার রোগ নির্ণয় যন্ত্র রয়েছে। এগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ঢাকা শহরের এক-তৃতীয়াংশ রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই ধরনের পরিকল্পনা থাকতে তো হবে। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রধান সমস্যা ব্যবস্থাপনা।’
পাঁচ শতাধিক হাসপাতাল চলছে ৪ হাজার টেকনোলজিস্টে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি দশ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে একজন চিকিৎসক, তিনজন নার্স ও পাঁচজন টেকনোলজিস্ট দরকার। সে হিসেবে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দরকার প্রায় ৯০ হাজার। কিন্তু বর্তমানে আছে ২৫ হাজারের মতো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে সরকারি হাসপাতালে টেকনোলজিস্টের পদ রয়েছে ছয় হাজার ৪০৬টি। এর মধ্যে আবার প্রায় অর্ধেক পদই ফাঁকা। কর্মরত মাত্র তিন হাজার ৮৯২ জন। সরকারি হাসপাতালে রোগ নির্ণয় না হওয়া কিংবা যন্ত্র পড়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ এই অত্যাবশকীয় জনবল সংকট। এর মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে শূন্য ২৭ শতাংশ এবং বিশেষায়িত হাসপাতালে শূন্য ৩৬ শতাংশ।
দীর্ঘদিন ধরে মিটফোর্ড হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে কর্মরত টেকনোলজিস্ট আউয়াল। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্ট না থাকায় প্রতিদিনের সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ব্লাড ব্যাংকে যেখানে ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু রাখতে হয়, সেখানে আছে মাত্র দুজন। তা দিয়েই দিনরাত ২৪ ঘণ্টার শিফট সামলানো, নৈশকালীন ডিউটি করতে হয়। বিশ্রাম কিংবা জরুরি প্রয়োজনে ছুটি নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি জানান, ‘২০১৪ সাল থেকে এখানে নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক জটিলতায় এক যুগেও তা আলোর মুখ দেখেনি। উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সগুলোতে প্যাথলজি ল্যাবের জন্য মাত্র একটি বা দুটি পদ নির্ধারিত। যার একটি বড় অংশ দীর্ঘকাল ধরে শূন্য। ২০০৮ সালে উপজেলা পর্যায়ে ফিজিওথেরাপির জন্য মাত্র একটি করে পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এ ছাড়া রেডিওলজি ও ফার্মাসিস্ট বিভাগে ২টি করে পদ থাকলেও নতুন পদ সৃষ্টির পুরো বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ের চিঠিপত্র চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।’
দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে মারাত্মক জনবল সংকট ও প্রশাসনিক অবহেলার চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমটিএ) সভাপতি খাজা মাঈন উদ্দিন মঞ্জু এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নীতিমালা অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অনুপাত ১:৩:৫ হওয়া উচিত। অথচ বর্তমানে দেশে সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৫০ হাজার নার্স থাকলেও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রয়েছেন মাত্র ৫ হাজারের মতো।
বিএমটিএ সভাপতি জানান, ২০১৩ সালের পর এই খাতে আর নতুন করে বড় কোনো নিয়োগ হয়নি। ২০২০ সালে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে একটি সার্কুলারের মাধ্যমে ২০২২ সালে জরুরি ভিত্তিতে ১,২০০ জন টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হলেও সেটি ছিল সাময়িক ব্যবস্থা।
খাজা মাঈন উদ্দিন মঞ্জু আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সগুলোতে রেডিওগ্রাফি ও ল্যাবে একটি করেই পদ রাখা হয়েছে, যা আজও বাড়ানো হয়নি। ৫০০ শয্যার শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০ জন রেডিওগ্রাফার থাকার কথা থাকলেও মাত্র একজন দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একইভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও প্রয়োজন অন্তত ২০০ জন টেকনোলজিস্টের, কিন্তু কাজ করছেন প্রায় ১০০ জন।’
জনবল সংকটের প্রভাবে সাধারণ রোগীরা মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে অল্প খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকলেও জনবলের অভাবে দুপুর ২টার পর অনেক ক্ষেত্রে এক্সরে বা অন্যান্য পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রোগীদের বাড়তি টাকা খরচ করে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। এ ছাড়া টেকনোলজিস্ট না থাকায় উপজেলা পর্যায়ে ব্লাড ব্যাংক সেবা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
৭৫ শতাংশ রোগীকে ছুটতে হচ্ছে বেসরকারিতে
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার মানের অবস্থা নিয়ে সম্প্রতি মাঠ পর্যায়ে দেশের ২২টি সরকারি হাসপাতালে ৯ মাস ধরে গবেষণা চালিয়েছে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)। গত মাসে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়।
পিপিআরসির গবেষণায় দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৯ ঘণ্টাই রোগ নির্ণয় বন্ধ থাকায় দেশের ৭৫ শতাংশ রোগীকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারমুখী হতে হচ্ছে। এতে করে সরকারি হাসপাতালে যে পরীক্ষা ২০০ টাকায় করতে পারতেন, বেসরকারিতে তা তিন থেকে পাঁচগুণ পর্যন্ত বেশি খরচে করতে হচ্ছে।
৫২ শতাংশ রোগ নির্ণয় যন্ত্র একবারের জন্যও ব্যবহার হয়নি
ওই গবেষণায় দেখা যায়, গত এক বছরে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর ৫২ শতাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা যন্ত্র একবারের জন্যও ব্যবহার হয়নি। বিগত সময়ে যেখানে ৬৫ শতাংশ রোগী নিয়মিত সেবা পেয়ে থাকেন, সেখানে তা নেমেছে এসেছে ২৫ শতাংশে। সেবা ব্যাহত হওয়ার এই প্রধান কারণ যন্ত্রপাতি সচল না থাকা।
গবেষণায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে প্রান্তিক পর্যায়ের। ৪২৬ উপজেলা হাসপাতাল চালু থাকলেও ১০১টিতেই বন্ধ এক্সরে পরীক্ষা। এ ছাড়া আল্ট্রাসনোগ্রাম হয়না ১৯৬টিতে, অধিকাংশ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হয় না ইসিজি। এমনকি দুই-তৃতীয়াংশ উপজেলা হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষ অচল অবস্থায় রয়েছে।
চিকিৎসা করাতে গিয়ে শেষ সম্বলও বিকিয়ে দিতে হচ্ছে
উত্তরের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুর রহমান ডালিম। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে নিজ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় কর্মরত তিনি। সম্প্রতি দ্বিতীয় দফায় মা পিয়ারা বেগমের (৭৯) হৃদরোগ দেখা দিলে শুরুতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, পরে রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেন। প্রায় এক মাস ধরে এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পিয়ারা বেগম।
গত ১৭ আগস্ট হৃদরোগ হাসপাতালের এইচডিইউতে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ডালিমের। তিনি জানান, ‘মায়ের আইসিডি (নির্দিষ্ট কিছু জটিল পেসমেকার) স্থাপন করতে হয়েছে। যেখানে শুধু ডিভাইস কিনতেই গেছে ৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, থাকা-খাওয়া, হাসপাতাল ভাড়াসহ এখন পর্যন্ত খরচ ১২ লাখ টাকার মতো। আবার অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে করাতে হয়।’
এশিয়া পোস্টকে ডালিম বলেন, ‘পরিবারের একমাত্র ছেলে আমি। বাবা এখন আর কাজ করতে পারে না। শিক্ষকতা করে আর কত টাকা বেতন পাই। উপায় না পেয়ে জমিজমা আর একটা গরু ছিল, সেটি বিক্রি করে মায়ের চিকিৎসা করছি। মাকে তো বাঁচাতে হবে, করার কিছু নেই।’
খোদ সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট বলছে, মোট চিকিৎসা খরচের ৭৯ শতাংশই ব্যয় করতে হয় নাগরিকের নিজস্ব পকেট থেকে।
চিকিৎসা কিনতে গিয়ে আরও দারিদ্র্যের মুখে পড়ার গল্প শুধু ডালিমের নয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্যমতে, চিকিৎসা মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর নতুন করে ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতের নীতি বদলাতে হবে রাষ্ট্রকেই: ডা. রশিদ-ই মাহবুব
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর কার্যকারিতা, জনবল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি ও জাতীয় স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব। তিনি বলেছেন, ‘সারাবিশ্বে হাসপাতাল সেবা ২৪ ঘণ্টা চালু থাকলেও দেশে তা চলছে মাত্র ছয় ঘণ্টার নিয়মে। এই ব্যবস্থার সংস্কার এবং স্বাস্থ্য খাতের নীতিগত পরিবর্তন চিকিৎসকদের কাজ নয়, এটি রাষ্ট্রকেই করতে হবে।’
ডা. রশিদ-ই মাহবুব এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালগুলোতে আসা-যাওয়ার সময় বাদ দিলে চিকিৎসাসেবা মেলে সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টা। পর্যাপ্ত জনবল ও ভালো সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না। পৃথিবীর সব দেশে হাসপাতাল সার্বক্ষণিক চালু থাকে। বাংলাদেশেও ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু করতে হলে অবিলম্বে প্রয়োজন জনবল বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক কাঠামোর আধুনিকায়ন।’
সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার সুযোগে স্বাস্থ্য খাতে এক ধরনের ‘দুর্বৃত্তায়ন’ গড়ে উঠেছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ সেবা না থাকায় চিকিৎসকদের বাইরে প্র্যাকটিস করার ঝোঁক বাড়ছে, যা থেকে রাষ্ট্র বা সাধারণ জনগণ সুবিধা পাচ্ছে না। রাষ্ট্র যদি কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না তৈরি করে, তবে ডাক্তারদেরও এককভাবে কিছু করার থাকবে না।
জনবল বাড়িয়ে দুই শিফটে সেবা চালুর পরিকল্পনা সরকারের
সংকট এড়াতে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়াতে দুই শিফটে কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। পাশাপাশি সংকট কাটিয়ে উঠতে জনবল এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী ও মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
স্বাস্থ্যসচিব কামরুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমানে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতালগুলোতে দিনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মতো সেবা চালু থাকে। রোগীদের আরও বেশি সময় চিকিৎসাসেবা দিতে দুপুর বা বেলা আড়াইটার পর থেকে বিকেল বা সন্ধ্যা পর্যন্ত দ্বিতীয় শিফট চালুর বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। তবে শুধু জনবল বাড়ালেই এ পরিকল্পনা সফল হবে না, এর সঙ্গে এক্সরে মেশিনের মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংখ্যাও বাড়াতে হবে।’
হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের পাশাপাশি মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে স্বীকার করে স্বাস্থ্যসচিব জানান, ‘বিষয়টি আগে সেভাবে গুরুত্ব না পেলেও বর্তমানে সরকারের শীর্ষপর্যায়ের নির্দেশনায় নতুন টেকনোলজিস্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া বৈকালিক সেবার বিকল্প হিসেবে দুই শিফটে আলাদা চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে সরকারি হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।’
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি কেউ অসুস্থ হলে উপজেলা, জেলা সদরের মধ্যেই যাতে ঠিকমতো চিকিৎসা পায়। সেখান থেকে সর্বোচ্চ বিভাগীয় হাসপাতালে যাতে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নিশ্চিত হয়। যত জটিল রোগই হোক সেটির চিকিৎসা পেতে যাতে নিজ বিভাগের বাইরে অন্য কোথাও কিংবা ঢাকায় আসতে না হয়, সেটি নিয়ে সরকার কাজ করছে। এ জন্য চিকিৎসক ও নার্সদের পাশাপাশি টেকনোলজিস্ট নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।’




