অভিভাবকহীন দিগন্ত টিভির সম্প্রচারে আসা অনিশ্চিত

অভিভাবকের অভাবে সম্প্রচারে আসতে পারছে না একসময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন ‘দিগন্ত টিভি’। ‘সত্য ও সুন্দরের পক্ষে’ স্লোগানে ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সালের ৫ মে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তি সম্প্রচারের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে শেষ পর্যন্ত টেলিভিশনটিকে সেই অনুমতি দেওয়া হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পরদিন পুনরায় সম্প্রচারের আবেদন করেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শিব্বির মাহমুদ। আবেদনের মাত্র দুই দিনের মধ্যে সম্প্রচার শুরুর অনুমতি পায় দিগন্ত টিভি। কিন্তু সেই অনুমোদনের ২২ মাস পার হলেও সম্প্রচারে আসতে পারেনি টেলিভিশনটি। নতুন করে সম্প্রচারে আসতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানও এখনও হয়নি।
মূলত প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মীর কাসেম আলীর মতো পেশাদার কোনো অভিভাবক না থাকায় পুনরায় চালু হচ্ছে না বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক শীর্ষস্থানীয় কর্মীরা। তারা বলছেন, একজন অভিভাবকের অভাবে এই জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনে এমন কেউ নেই, যিনি উদ্যোগ নিয়ে পুনরায় টেলিভিশনটিকে সম্প্রচারে নিয়ে আসবেন।
দিগন্ত টিভির যাত্রা
২০০৭ সালে দিগন্ত টেলিভিশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী। ‘দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন লিমিটেড’-এর অধীনে ২০০৮ সালে সম্প্রচারে আসে টেলিভিশনটি। মীর কাসেম আলীর সঙ্গে দেশের তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর ২৩ জন প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা ছিলেন।
‘দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন লিমিটেড’-এর মেমোরেন্ডাম অ্যান্ড আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনস (সংঘ স্মারক ও সংঘবিধি)-তে দেখা যায়, কোম্পানিটির ২৫ কোটি শেয়ার ও প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ১০ টাকা হিসেবে অনুমোদিত মূলধন ধরা হয় ২৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ১১ লাখ ৫০ হাজার শেয়ার পেইডআপ ক্যাপিটাল হিসেবে বিনিয়োগ দেখানো হয় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। তবে পরে এই বিনিয়োগ দাঁড়ায় ১৫০ কোটিতে।
সব প্রস্তুতি শেষ করে ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেদিন দিগন্ত টিভির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, প্রয়াত আ স ম হান্নান শাহ এবং জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। আয়োজকদের পক্ষে বক্তব্য দেন দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান কমোডর (অব.) এম এ রহমান।
দেশের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সর্বাধিক জনপ্রিয় টিভি
২০০৮ সালে উদ্বোধনের আগে টেলিভিশনটির রাজধানীর পুরানা পল্টনের আল রাজী কমপ্লেক্সের তিনটি ফ্লোর কিনে নেয় দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন। তৎকালীন সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি আমদানি করা হয়।
দিগন্ত টিভির তৎকালীন ব্রডকাস্ট হেড আবুল হাসান এশিয়া পোস্টকে জানান, ২০০৮ সালে সম্প্রচারে আসার সময় টেলিভিশনটি সবশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। তখন এই চ্যানেলটি ছিল সম্পূর্ণ অটোমেশন প্রযুক্তিসম্পন্ন, যা ওই সময় বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মধ্যে ছিল হাতে গোনা। স্টুডিও, ক্যামেরাসহ সব যন্ত্রপাতি ছিল তৎকালীন সর্বশেষ প্রযুক্তির।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দিগন্ত টেলিভিশন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ভিজার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে। সরাসরি সম্প্রচার, টেলিভিশন নিউজ, খেলাধুলা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের জন্য রিয়েলটাইম থ্রিডি গ্রাফিক্স, ভার্চুয়াল স্টুডিও এবং এআর (অগমেন্টেড রিয়ালিটি) সলিউশনের সমন্বয়ে এটি সে সময়ে সম্প্রচারে থাকা অন্য টেলিভিশনগুলোর চেয়ে সংবাদ উপস্থাপনায় নতুনত্ব নিয়ে আসে।
গভীর রাতে যেভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়
২০১৩ সালের ৫ মে সকাল থেকে ঢাকার মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ প্রথম লাইভ সম্প্রচার শুরু করে দিগন্ত টিভি। পরে অন্যরাও লাইভ সম্প্রচার শুরু করে। রাতে শাপলা চত্বরে যৌথ বাহিনীর অভিযানের দৃশ্যও সরাসরি সম্প্রচার করে দিগন্ত টিভি।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে রাত আড়াইটার দিকে বিটিআরসির একটি প্রতিনিধিদল দিগন্ত টিভির কার্যালয়ে প্রবেশ করে। তারা টেলিভিশনের অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চায়। কাগজপত্র দেখার পর মাস্টার কন্ট্রোল রুম বা এমসিআরে প্রবেশ করেন বিটিআরসির ওই দলের সদস্যরা। সম্প্রচার সুউচ অফ করে দিয়ে আপলিংক ও ডাউনলিংক মডিউলেটর খুলে নিয়ে যায়। পরে সিলগালা করে দেওয়া হয় দিগন্ত টিভির এমসিআর রুম। কারণ জানতে চাইলে কর্মকর্তারা শুধু বলেন, ওপরের নির্দেশে সাময়িকভাবে সম্প্রচার বন্ধ করা হলো।
সিলগালা করার সময় দিগন্ত টিভির কর্মকর্তাদের জানানো হয়, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সম্প্রচার বন্ধ থাকবে। প্রতিষ্ঠানটি যখন বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন দর্শক জনপ্রিয়তার মাত্রা নির্ধারণ সূচক-টিআরপিতে এটি ছিল এক নম্বর অবস্থানে।
‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ ও দিগন্ত টিভি বন্ধ
শাপলা চত্বরে ১৩ দফা দাবিতে কর্মসূচির ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ওই কর্মসূচি ঘিরে দিনভর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশের সঙ্গে হেফাজত সমর্থকদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয় ঢাকার মতিঝিল, পল্টন, আরামবাগ, বিজয়নগর, বায়তুল মোকাররম, তোপখানাসহ পুরো এলাকাজুড়ে। সারা দিন ধরে চলা সংঘর্ষে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। বিকেলের দিকে শাপলা চত্বর থেকে ঘোষণা আসে, ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ঢাকার রাজপথ ছাড়বে না হেফাজতে ইসলাম।

অরাজনৈতিক কর্মসূচি হলেও পরে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের সমর্থন পায় ওই আন্দোলন। শাপলা চত্বর খালি করতে গভীর রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নামে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই ঘটনা সরাসরি দিগন্ত টিভির মাধ্যমে দেখেছেন দর্শকরা। ওই রাতেই যেহেতু দিগন্ত টিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাই মনে করা হয়, হেফাজতের কর্মসূচি সরাসরি সম্প্রচারের কারণেই বন্ধ করা হয়েছে দিগন্ত টিভি।
বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও খুলতে দেয়নি সরকার
জানা যায়, বন্ধ হওয়ার পরও বহুদিন স্যাটেলাইট ভাড়া পরিশোধ করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি দিগন্ত টিভি। তখন তথ্যমন্ত্রী ছিলেন হাসানুল হক ইনু। সে সময় টেলিভিশনটি পুনরায় সম্প্রচারে আনার বিষয়ে তিনি দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে বারবার আশ্বাস দেন। তখন দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার ইস্কান্দার আলী।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ছিলেন তার আত্মীয়। গওহর রিজভীও আশ্বাস দিয়েছিলেন সম্প্রচারের ব্যবস্থা করে দেবেন। কিন্তু কোনোভাবেই আর সম্প্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়নি। মূলত তাদের আশ্বাসের প্রেক্ষিতেই সব ধরনের বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আদালতে যায়নি দিগন্ত টিভি কর্তৃপক্ষ। দিগন্ত টিভির ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কর্মীদের মানবেতর অবস্থা
দিগন্ত টেলিভিশন যখন বন্ধ হয় তখন প্রায় সাড়ে ৪০০ জনবল ছিল। এর মধ্যে ৩৫০ জন কর্মরত ছিলেন ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে। বাকিরা ছিলেন বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে। তখন বেশির ভাগ গণমাধ্যমই ঢাকার বাইরে প্রতিনিধিদের বেতন দিত না, সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল দিগন্ত টিভি।
দিগন্ত টিভির তৎকালীন একাধিক কর্মী জানান, প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কর্মীরা ভেঙে পড়েন। বন্ধ হওয়ার পরও টানা তিন মাস সব কর্মীকে বেতন দেয়। এরপর আর বেতন-ভাতা দিতে পারেনি। চাকরি হারিয়ে নয়ন নামে এক ক্যামেরাপারসন হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।

তিন মাস পর হাতেগোনা কয়েকজন কর্মী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান। তবে জামায়াত ট্যাগের কারণে বেশির ভাগ কর্মীই আর মিডিয়া হাউসে চাকরি করতে পারেননি। ফলে তাদের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়ে মিডিয়া ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যায়। বেশকিছু কর্মী পাড়ি জমান বিদেশে।
দিগন্ত টিভির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এনামুল হক বলেন, ‘টেলিভিশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির চেষ্টা করি। কিন্তু সিভিতে দিগন্ত টিভির অভিজ্ঞতা উল্লেখ করা দেখে কেউ চাকরি দিতে রাজি হতেন না। প্রায় এক বছর বেকার থাকার পর বাধ্য হয়ে একটি টিভিতে রিপোর্টিং ছেড়ে অন্য বিভাগে জয়েন করি।’
সব যন্ত্রপাতি এখন অকেজো
প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি, ট্রান্সমিটার ও স্টুডিওর মূল্যবান সরঞ্জাম, দামি ক্যামেরা, এডিটিং প্যানেল, দামি লাইট ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়েছে। এগুলো এখন ভাঙারি হিসেবে বিক্রি ছাড়া অন্য কোনো কাজে লাগানোর উপযোগী নেই। দীর্ঘ এই সময়ে দিগন্ত টিভির বেশকিছু সম্পত্তিও বিক্রি করেছে মালিকপক্ষ।
জানা যায়, গাজীপুরে দিগন্ত টিভির নামে অনেক জমি ছিল, পরে তা বিক্রি করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া আল রাজী ভবনে দিগন্ত টিভির মালিকানায় থাকা তিনটি ফ্লোরের মধ্যে একটি বিক্রি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে দিগন্ত টিভির সাবেক ম্যানেজার (অপারেশন) মাকসুদ কামাল বাবু বলেন, ‘ওই সময় সব যন্ত্রপাতি ছিল আধুনিক ও দামি। সবকিছু এখন অকেজো। তা ছাড়া পরবর্তী সময়ে আরও আধুনিক প্রযুক্তি এসেছে। এখন দিগন্ত শুরু করতে গেলে সবকিছুই নতুন করে করতে হবে।’
সম্প্রচারে আসতে বাধা কোথায়
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাত্র তিন দিনের মধ্যে অনুমোদন পেলেও এখনও সম্প্রচারের প্রস্তুতি শুরু করতে পারেনি দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, দিগন্ত টিভির অফিস আল রাজী কমপ্লেক্সের ফ্লোর ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার উপযোগী নেই। এজন্য নতুন করে অফিস নির্মাণ করতে হবে। এ ছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়াও শুরু করতে হবে।
বর্তমান অবস্থায় টেলিভিশনটি নতুন করে শুরু করতে যে অর্থের প্রয়োজন হবে, তা দিতে এখনও কেউ রাজি হয়নি। সাধারণভাবে শুরু করতে অন্তত ১০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। আর বর্তমান সময়ের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে শুরু করতে গেলে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ দরকার হবে।
অন্যদিকে বর্তমান মালিকদের কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়। মালিকানা হস্তান্তর করতে গেলে তাদের কেউ কেউ বিনিয়োগের সমুদয় টাকা ফেরত চাইছেন। তাদের টাকা ফেরতসহ টেলিভিশনটি নতুন করে চালু করতে গেলে অন্তত ৬০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। নতুন করে সম্প্রচারের আনার চেষ্টা করেছেন এমন ব্যক্তিরা এশিয়া পোস্টকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিনিয়োগ সংগ্রহ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কেউ না নেওয়ায় থমকে আছে কার্যক্রম। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
দিগন্ত টিভির শীর্ষস্থানীয় পদে কর্মরত ছিলেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘টেলিভিশনটির এখন মূলত একজন অভিভাবকের অভাব। উদ্যোগী হয়ে বিনিয়োগ নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটি চালু করবেন—এমন কেউ না থাকায় অনুমতি পাওয়ার পরও সম্প্রচারে আসতে পারছে না।’
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্কিত মালিক ও কর্মীরা দলের পক্ষ থেকে নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু দল থেকেও কেউ উদ্যোগী হয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালু করতে এগিয়ে আসছেন না বলে জানান তিনি।
মালিকানায় ছিলেন যারা
জয়েন্ট স্টকে নিবন্ধিত দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন লিমিটেডের মেমোরেন্ডামে দেখা যায়, শুরুতে শেয়ারের মালিক ছিল ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আর পরিচালক ছিলেন ২৩ জন।
এর মধ্যে ইবনে সিনা ট্রাস্ট ছিল সবচেয়ে বেশি ১ লাখ ৫০ হাজার শেয়ারের মালিক। ট্রাস্টের পক্ষ থেকে তিনজনকে পরিচালক হিসেবে মনোনীত করা হয়। তারা হলেন—কমোডর (অব.) এম এ রহমান, মীর কাসেম আলী এবং এ এন এম এ জাহের।
মীর কাসেম আলীর কেয়ারি লিমিটেডের নামে এক লাখ শেয়ার। কেয়ারির পক্ষে দুজন—ইঞ্জিনিয়ার এসকান্দার আলী খান ও মো. শামসুল হুদাকে পরিচালক করা হয়।
বাকি ১৮ জন পরিচালক ছিলেন—ইউনূস গ্রুপের মালিক মুহাম্মদ ইউনূস ও তার স্ত্রী মাহফুজা ইউনূস, এস আলম গ্রুপের আব্দুস সামাদ ও আব্দুল্লাহ হাসান (দুই ভাই), বিডি ফুডসের মালিক মো. বদরুদ্দোজা, মোহাম্মদ আবু শাহরিয়ার, মো. নুরুল ইসলাম, সুইস টেক্সের মালিক মো. শিব্বির মাহমুদ, দুই ভাই ব্যবসায়ী খন্দকার এনায়েত হোসাইন ও খন্দকার জাকির হোসাইন, আদনান টেক্সটাইলের মালিক আবুল কালাম আজাদ, নোমান গ্রুপের মালিক রফিকুল ইসলাম, এইচ স্টিলের মালিক মো. হারুনুর রশিদ, মুন্সীগঞ্জ বিএনপি নেতা ও মোশাররফ গ্রুপের মালিক মোশাররফ হোসাইন, স্ট্যান্ডার্ড লুঙ্গির মালিক হেলাল মিয়া, শাহজালাল ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালক মোহাম্মদ হাসান ও তার স্ত্রী রুমা হাসান এবং মীর কাসেম আলীর ছোট ভাই মীর হাসান আলী। এই ১৮ জনের প্রত্যেকে পাঁচ হাজার করে শেয়ারের মালিক।
মালিকানায় পরিবর্তন ও বর্তমান অবস্থা
শুরুতে জয়েন্ট স্টকে নিবন্ধনের সময় দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন লিমিটেডের যে ২৩ জন উদ্যোক্তা-পরিচালক ছিলেন, পরে সেখানেও পরিবর্তন আসে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২১ সালের সংশোধনে (শিডিউল টুয়েলভ ফর্ম) দেখা যায়, প্রতিষ্ঠাকালীন ২৩ জন পরিচালকের মধ্যে বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ৯ জন। তারা হলেন—ইঞ্জিনিয়ার এসকান্দার আলী খান, মো. শামসুল হুদা এফসিএ, মুহাম্মদ ইউনূস, মাহফুজা ইউনূস, মো. শিব্বির মাহমুদ, খন্দকার এনায়েত হোসেন, খন্দকার জাকির হোসেন, মো. আবুল কালাম আজাদ এবং মোহাম্মদ হাসান।
নয়জনের সঙ্গে নতুন করে আরও দুজন যুক্ত হয়েছেন। তারা হলেন—ইবনে সিনা ট্রাস্টের প্রতিনিধি হিসেবে কাজী হারুন-অর-রশিদ। অন্যজন মো. শাহজাহান খান।

বর্তমানে ১১ সদস্যের পরিচালনা বোর্ডে চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন মো. শিব্বির মাহমুদ। ভারপ্রাপ্ত হিসেবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি।
এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। শেষ পর্যন্ত বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে, এ বিষয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন শিব্বির মাহমুদ। দিগন্ত টিভি কবে আসছে? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দিগন্তের সব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন সম্প্রচারে আসতে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন। সাবেক চেয়ারম্যান মীর কাসেম আলী তার নিজ উদ্যোগে অনেক ব্যবসায়ীকে একত্রিত করেছিলেন। এখন তিনি নেই, ফলে নতুন উদ্যোগ কাউকে না কাউকে তো নিতে হবে। মীর কাসেম আলীর পর শাহ আবদুল হান্নানও চেয়ারম্যান ছিলেন। পরবর্তী কমোডর (অব.) এম এ রহমান চেয়ারম্যান হন। তারা কেউই এখন আর পৃথিবীতে নেই। পরপর প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন অভিভাবক বিদায় নেওয়ায় দিগন্ত পুনরায় সম্প্রচারে আসার কাজে গতি পাচ্ছে না। তবে সম্প্রচারে আসবে বলে আশা করেন তিনি।
.png)



