ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, হামের মতো পরিস্থিতির শঙ্কা

কয়েক দশকের মধ্যে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে জর্জরিত দেশ। সরকারি হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ৬০৫ শিশু। এর মধ্যেই ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে মশাবাহিত ভাইরাস জ্বর ডেঙ্গু। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৫৫ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়েছে। বুধবার (৩ জুন) পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিন হাজার ৪৫৯ জন, মৃত্যু হয়েছে অন্তত ছয়জনের।
মৌসুম শুরুর আগেই এমন চিত্র উদ্বেগের। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হাম আর ডেঙ্গু, দুই সংকট একসঙ্গে মোকাবিলার চ্যালেঞ্জে পড়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘একদিকে হাম অন্যদিকে ডেঙ্গু কড়া নাড়ছে। আমাদের সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত থাকলে, এর মধ্যে ডেঙ্গু বড় আক্রমণ করলে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।’
বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য বলছে, ভর্তি রোগীর বাইরে কয়েকগুণ বেশি রোগী বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শারীরিক অবস্থা জটিল হলেই কেবল হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ পুরুষ, ৩৭ শতাংশ নারী।
বিভাগওয়ারি সংক্রমণে এগিয়ে বরিশাল। মোট আক্রান্তের ২৪ শতাংশের বেশি দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর বাসিন্দা।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে আক্রান্তের হার ২৩ শতাংশ, চট্টগ্রামে ২২ শতাংশ। এরপর রয়েছে ঢাকা বিভাগ (মহানগরের বাইরে), খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুর। মৃত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই পুরুষ।
ভয়াবহ পরিস্থিতির শঙ্কা
দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতার ইতিহাস দীর্ঘ। ২০১৯ সালে প্রথমবার রোগীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর এক লাখ এক হাজার ৩৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হন, মারা যান ২৬৩ জন।
করোনা মহামারির সময় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে ভাটা পড়ে। ২০২২ সালে ভর্তি রোগী কিছুটা কমলেও মৃত্যু হয় ২৮১ জনের। ২০২৩ সালে রেকর্ড তিন লাখেরও বেশি রোগী ভর্তি হয়। মৃত্যু হয় এক হাজার ৭০৫ জনের। ২০২৪ সালে এক লাখের বেশি ভর্তি ও ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। গত বছরও এক লাখের ওপর ভর্তি ও ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে জরিপ লাগবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর না পারলেও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মশার ঘনত্ব নিয়ে বেশ কয়েকটি এলাকায় জরিপ চালিয়েছি। তাতে দেখা যাচ্ছে, আবারও পরিস্থিতি গুরুতর হবে। ২০২৩ সালের মতো ভয়াবহ না হলেও কাছাকাছি যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব স্থানে আমরা জরিপ চালিয়েছি সেখানে লার্ভার ঘনত্ব অনুযায়ী এবারও ডেঙ্গু অনেক ভোগাবে। ঢাকায় কিছুটা কম হলেও বরিশাল, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, গাজীপুর, চাঁদপুর ও মানিকগঞ্জের মতো জেলাগুলোতে পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।’
ডেঙ্গু ছড়ানোর পেছনে তিনটি নিয়ামকের কথা তুলে ধরেন অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তার ভাষায়, ‘এপিডেমিউলোজিক্যাল ট্রাঙ্গায়েল অনুযায়ী, ডেঙ্গুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবেশ, ভাইরাস ও মশার ঘনত্ব। ভাইরাস ও মশা আছে কিন্তু ছড়ানোর পরিবেশ নেই, তাহলে বিস্তার ঘটবে না। আবার পরিবেশ ঠিক আছে কিন্তু মশা ও ভাইরাসের উপস্থিতি বেশি তাহলেও ছড়াবে না। কিন্তু তিনটির কোনোটিই ঠিক না থাকলে প্রকোপ বাড়ে। এজন্য হয় আমাকে মশা মারতে হবে অথবা রোগীকে সম্পূর্ণ আটকাতে হবে কিংবা মশা যাতে বসত গড়তে না পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
বন্ধ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ
ডেঙ্গু পরিস্থিতির আগাম পূর্বাভাস পেতে প্রতিবছর তিনটি মাঠ জরিপ পরিচালনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি)। বর্ষার আগে, বর্ষাকালে ও বর্ষার পরে করা এই জরিপগুলো থেকে এলাকাভিত্তিক মশার ঘনত্ব, ঝুঁকির মাত্রা ও করণীয় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু গত দেড় বছরে একটিও জাতীয় জরিপ হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হওয়ায় অর্থাভাবে সিডিসি জরিপ চালাতে পারেনি। পরে এই দায়িত্ব রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে (আইইডিসিআর) দেওয়া হলেও তারাও কোনো জরিপ পরিচালনা করতে পারেনি। এর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তথা সিটি করপোরেশনগুলোতেও কীটতত্ত্ববিদের তীব্র সংকট রয়েছে।
উচ্চঝুঁকিতে ডিএসসিসির ২৭ ওয়ার্ড
নিজস্ব অর্থায়নে জরিপ চালিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। গত ১২ থেকে ২৩ মে ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডে পরিচালিত এই বর্ষাপূর্ব জরিপে সিডিসির টিমও অংশ নেয়। এতে দেখা যায়, ৬৩টি ওয়ার্ডে এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের (ব্রুটো ইনডেক্স) চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড উচ্চঝুঁকিতে।
প্রজননস্থলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বহুতল ভবনে এডিসের ঘনত্ব সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ। একক বাড়িতে প্রায় ২৮ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭ শতাংশ এবং সেমিপাকা বাড়িতে প্রায় ১৫ শতাংশ লার্ভা শনাক্ত হয়েছে। মেঝেতে জমা পানিতে ১২ শতাংশ, বালতিতে ১০ শতাংশ এবং প্লাস্টিকের ড্রামে প্রায় ৯ শতাংশ প্রজননক্ষেত্র পাওয়া গেছে।
ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন জানান, ‘গত বছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জরিপ করতে পারেনি। তাই, ডিএসসিসির ব্যবস্থাপনায় জরিপ চালানো হয়েছে। তবে সিডিসির টিম এ জরিপে অংশ নিয়েছে। জরিপের ওপর ভিত্তি করে আগামী ৭ জুন থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমন্বয়ে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হবে। পরবর্তী সপ্তাহে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ৩৬টি ওয়ার্ডেও একই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) গত বছরের সেপ্টেম্বরে নিজস্ব অর্থায়নে জরিপ চালিয়েছিল। এতে ২৫টি ওয়ার্ড ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। চলতি বছর নতুন জরিপ না চালিয়ে গত বছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী।
তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গত বছর এই সময়ে যে পরিমাণ রোগী ছিল, এবার তার প্রায় ৭৫ শতাংশ কম। কোরবানির ফলে বিভিন্ন জায়গায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর থেমে থেমে বৃষ্টি হলে ঝুঁকি বাড়বে। ফলে পরিস্থিতি এবার কতটা ভয়াবহ হবে এখনই বলা সম্ভব নয়। বর্তমানে যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তারা কোন ভাইরাসে হচ্ছে, সেটি ধরতে পারলে প্রস্তুতি আরও সহজ হবে।’
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় গতি বেড়েছে
বিগত বছরগুলোতে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরুর আগে সরকারের তেমন প্রস্তুতি দেখা যেত না বলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা ছিল। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। মৌসুম শুরুর আগেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় বেড়েছে। শুধু মে মাসেই দুই সিটি করপোরেশন এবং ঢাকার বাইরে সিভিল সার্জনদের সঙ্গে ছয়টি সভা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকেও এসেছে কঠোর নির্দেশনা। আগামী শনিবার থেকে তিন মাসব্যাপী জোরালো কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার।
ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ‘এবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে যতটা আন্তরিকতা নিয়ে সময়ের আগেই প্রস্তুতি নিতে জোর দিতে দেখা যাচ্ছে, অতীতে কখনো এমনটা হয়নি। আমরাও কোনো কেস পেলে সে রোগীর ঠিকানা ধরে তার বিস্তারিত তথ্য নিচ্ছি। কিভাবে আক্রান্ত হলেন, কতদিন ধরে আক্রান্ত; সবকিছু জেনে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
বুধবার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিনই সভা করা হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের সঙ্গেও সমন্বয় করে কর্মসূচি হচ্ছে। প্রত্যেক সিটি করপোরেশনকে লার্ভা ও উড়ন্ত মশা মারার জন্য বিরতিহীন কীটনাশক প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে।’
ভাইরাসের ধরন শনাক্তের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সংক্রমণ কোন ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। ধরন শনাক্ত করা গেলে ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে। ইতোমধ্যেই সোসাইটি অব মেডিসিন কাজ শুরু করেছে। সারাদেশে শনিবার থেকে জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন অফিসে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেবে তারা। একই সঙ্গে সিভিল সার্জন অফিসের অধীনে উপজেলা পর্যায়ে একটি করে টিম হবে। যাতে আক্রান্ত হলে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসাটা দেওয়া হয়।’
সরকারি সিদ্ধান্তের মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন নিয়ে অবশ্য সংশয় প্রকাশ করেছেন কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, ‘সাধারণত সরকারের ওপর মহলে যে আলোচনা আমরা দেখি, নিচের স্তরে তার বাস্তবায়ন হয় না। যে নির্দেশনাগুলো দেওয়া হয়, মাঠ পর্যায়ে তার সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা তদারকি করতে হবে।’
এক লাখ ব্যাগ স্যালাইন মজুত
বিগত বছরগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তরল স্যালাইনের তীব্র সংকট দেখা দেয়। রোগীদের বাজার থেকে অতিরিক্ত দামে স্যালাইন কিনতে হয়। এমন পরিস্থিতি এড়াতে এবার আগেভাগেই বিদেশ থেকে কেনা এক লাখ ব্যাগ স্যালাইন মজুত রেখেছে সরকার।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ডেঙ্গুর অতীত অভিজ্ঞতায় প্রকোপ বাড়লে স্যালাইনের সংকট দেখা দেয়। কিন্তু দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই এখন স্যালাইন উৎপাদন করে না। এজন্য বিদেশ থেকে কেনা এক লাখ ব্যাগ স্যালাইন মজুত করে রাখা হয়েছে। এছাড়াও কয়েক হাজার স্যালাইন হাসপাতালগুলোতে রয়েছে। এর বাইরে ইউনিসেফ ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটিকেও স্যালাইন দিতে বলা হয়েছে।’
সম্পৃক্ততা বাড়ছে বেসরকারি হাসপাতালের
সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ সামলাতে এবার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতালকে ১০ শতাংশ শয্যা ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিনামূল্যে রাখার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। শুধু শয্যা নয়, রোগ নির্ণয়সহ অন্যান্য খরচের ৮০ শতাংশ মওকুফ করতেও সম্মত হয়েছে বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সঙ্গে বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। খাবার ও ওষুধ ছাড়া রোগ নির্ণয়সহ অন্যান্য খরচ ৮০ শতাংশ মওকুফ করা হবে। চিকিৎসকদের ফি-ও নেওয়া হবে না।




