দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে, ৯ মাসে প্রাণ হারাল ৬৭ জন

সারা দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ১৩৮টি গুলির ঘটনায় ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ ২১ জেলায় গুলিতে প্রাণ গেছে ৬৭ জনের। এ সময়ে আহত হয়েছে অন্তত ১৪৫ জন। এর মধ্যে খুলনায় ১৫ জন এবং চট্টগ্রামে ১৩ জন নিহত হয়েছেন। পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) দেওয়া তথ্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
ডিএমপি সূত্র জানায়, গত ৯ মাসে রাজধানীতে ১৭টি গুলির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়। একই সময় সর্বাধিক ৩৯টি ঘটনা ঘটে খুলনায়। সর্বশেষ গত রোববার খুলনায় দুটি গুলির ঘটনার কয়েক দিন আগে আরও দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ৩১টি গুলির ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অপরাধী ও দুর্বৃত্তদের হাতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মজুদ বাড়তে থাকে। এ সময় থানা ও ফাঁড়ি থেকে পুলিশের লুট হওয়া পাঁচ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের বেশির ভাগ সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যায়। এর মধ্যে ১৩ শতাধিক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এর বাইরে সীমান্তের চোরাই পথে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র ঢোকে দেশে। এসব অস্ত্রে এখন খুনাখুনি বাড়ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রে পুলিশকে গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। ২০২৫ সালে দেশে ২৫০ জনের বেশি গুলিবিদ্ধ হয় এবং অন্তত ৮০ জন মারা যায় বলে এইচআরএসএসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন শহর থেকে গ্রামে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাড়ছে। এসব অস্ত্রধারীর বেশির ভাগ কিশোর-তরুণ। এরা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবে অর্থের বিনিময়ে ‘শ্যুটার’ হিসেবে ভাড়া খাটছে। এদের নিয়ন্ত্রণে পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে অস্ত্রধারী চক্র। তারা নিয়ন্ত্রণ করছে মাদকের স্পট। এরা প্রায়ই পথচারীদের অস্ত্র ঠেকিয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ তাদের ভয়ে থানায় অভিযোগ করতেও সাহস পাচ্ছে না।
লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান আরও জোরদারে তথ্য প্রদানকারীদের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের জন্য বিশেষ ইউনিট গঠন করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ এ সময় ৪৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, চার হাজার ৭২২ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ১৬৫টি ম্যাগাজিন, ৬৫টি ককটেল, সোয়া দুই কেজি গানপাউডার, ৮৯৩টি দেশীয় অস্ত্র, ৭১টি অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ২১টি অস্ত্র ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম এবং ১০ হাজার ৩০০টি চকোলেটবাজি উদ্ধার করেছে। উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে রয়েছে—পিস্তল ১৫৩টি, শ্যুটারগান ৪৮টি, এলজি ৪৫টি, রিভলবার ২৬টি, বন্দুক ১০৮টি, পাইপগান ২৬টি, শটগান সাতটি, রাইফেল সাতটি, এসএমজি তিনটি, এয়ারগান ১২টি ও পেনগান একটি।
সম্প্রতি রাজধানীর ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার সময় একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়। এ সময় হামলাকারীরা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। রাড্ডা ধ্বংসস্তূপের ঘটনায় জড়িতদের কাছেও ঘটনার সময় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
এসব অপরাধমূলক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবি বলেছে, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ সারা দেশে জোরালো অভিযানের আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, সাম্প্রতিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, তা বলার সুযোগ কম। অপরাধীরা নিঃশঙ্কচিত্তে প্রকাশ্যে একের পর এক ঘটনা ঘটাচ্ছে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ

