পরিবার ও অভিজাততন্ত্র গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য কখনো ইতিবাচক না: ইফতেখারুজ্জামান

পরিবারতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্র গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য কখনো ইতিবাচক হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
রোববার (১ নভেম্বর) টিআইবির কার্যালয়ে 'বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন' শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তৃণমূল, বিভিন্ন বৈচিত্র্যের মানুষ ও নারীদের অংশগ্রহণের ঘাটতির কারণে নেতৃত্ব বিকাশে পরিবারতন্ত্র বা অভিজাততন্ত্র প্রাধান্য পাচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য সাধারণ মানুষ সুযোগবঞ্চিত হচ্ছে। এটা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য কখনো ইতিবাচক হতে পারে না। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার।
তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর যেকোনো দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় যতটুকু অর্জন হয়েছে, তার সিংহভাগের কৃতিত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। তবে যতটুকু অর্জন হয়নি, সেই ব্যর্থতার দায় অন্যান্য অংশীজনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিতে হবে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসনের ঘাটতি ব্যাপক। আইন ও বিধিমালা বিদ্যমান থাকলেও দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা এবং রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ও শক্তিশালী আইনি কাঠামোর অভাব রয়েছে। পাশাপাশি, দেশের বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার সঙ্গে আন্তর্জাতিক চর্চারও উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্যতা রয়েছে।
সংবিধান, সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিবিধান ও দলীয় গঠনতন্ত্র পরিপালন না করার প্রবণতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যতটুকু পরিপালন করা হয়, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে মূলত প্রতীকী।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতার রাজনীতির চর্চার অবসান ঘটবে। সেখানে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ক্ষমতার রাজনীতির কারণে দলীয় কোন্দল, অন্তর্দ্বন্দ্ব, এমনকি মানুষের প্রাণ দিতে হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ের চেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সেটি আরও বেশি বিকশিত হচ্ছে। এটা উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতিসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকা এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণে রাজনৈতিক দলগুলোতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গণতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের উত্তম চর্চার সঙ্গে বাংলাদেশের চিত্রের সামঞ্জস্য নেই বলেও মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া অতি নিয়ন্ত্রণমূলক। অন্যদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের কার্যকর পদ্ধতি না থাকায় আইনি শর্তভিত্তিক ব্যবস্থা শুরুতেই অর্থনির্ভর প্রতিযোগিতামূলক পৃষ্ঠপোষকতা তৈরি করে।
বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় বলে মন্তব্য করেছেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ ব্যবস্থাপনা মূলত অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ব্যক্তিনির্ভর হওয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকে। দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে আয়-ব্যয়ের যে হিসাব দেয়, তার সঙ্গে প্রকৃত চিত্রের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকার প্রভাব ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কিংবা দলীয় অবস্থান ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দলীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ সংস্কারের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে। দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় দলগুলোকে নিজেদের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।


