logo
Advertisement

পে-স্কেলের সুখবরের আড়ালে বেসরকারি চাকরিজীবীদের চাপা কষ্ট

• পে-স্কেল অনুমোদনে সরকারি চাকরিজিবীদের মধ্যে উচ্ছাস

• বাড়তে পারে বাড়ি ভাড়া, পরিবহন ভাড়াসহ জীবনযাত্রার মান

• মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির শঙ্কা

• বৈষম্য অনুভব করছেন বেসরকারি চাকরিজীবীরা

• সামষ্টিক অর্থনীতিকে চাঙা করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

পে-স্কেলের সুখবরের আড়ালে বেসরকারি চাকরিজীবীদের চাপা কষ্ট
সরকার ৯ম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করেছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিক্স

দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অনুমোদন পেয়েছে নবম জাতীয় পে-স্কেল। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এই চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার খবর সামনে আসতেই সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বইছে আনন্দের বন্যা।

Advertisement

দীর্ঘ ১১ বছর পর বেতন বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তকে তারা দেখছেন জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে।

কিন্তু এই সিদ্ধান্তের অপর পিঠে তৈরি হয়েছে বড় আকারের উদ্বেগ। প্রশ্ন উঠেছে, সাধারণ বেসরকারি চাকরিজীবী, খেটে খাওয়া মানুষ এবং নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে?

এছাড়া প্রশ্ন উঠেছে সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে কি না?

নতুন পে-স্কেলে কী থাকছে?

অনুমোদিত নবম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ গ্রেড পর্যন্ত বেতনবৃদ্ধির প্রস্তাব পাস করা হয়েছে। ২০১৫ সালের অষ্টম পে-স্কেলের পর গত কয়েক বছরের ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই সমন্বয়ের দাবি উঠছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি বাজেট ও রাজস্বের ভারসাম্যের কথা মাথায় রেখে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও এতে সরকারের পরিচালন ব্যয় এক লাফে অনেকটাই বেড়ে যাবে।

নতুন এই কাঠামোর আওতায় ২০ লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি উপকৃত হবেন।

সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়বে?

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এটি সুখবর হলেও দেশের ৮৫ ভাগের বেশি বেসরকারি খাত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন।

পে-স্কেল ঘোষণার খবর আসামাত্রই বাড়িভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসাসেবা ও গৃহস্থালি বিভিন্ন কাজে খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন অনেকেই। তারা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীরা বাড়তি বেতন দিয়ে এই চাপ সামাল দিতে পারলেও নির্দিষ্ট আয়ের বেসরকারি কর্মজীবীদের জন্য এটি অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাড়াতে পারে।

বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক চাপের কারণে বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এখন নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি খাতের বেতন এক লাফে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে দুই শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব বৈষম্যও তৈরি হবে।

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপনন বিভাগের কর্মী আলমগীর হোসেন জানান, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ে, কিন্তু আমরা ঠিকমতো মূল বেতনই পাই না। এ ছাড়া মাস শেষে টার্গেট পূরণ না হলে বেতন দিতেও তালবাহানা করে।’

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বেসরকারি শ্রমিকদেরও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের শ্রমিকদেরও তো গত কয়েক বছরে মজুরি বৃদ্ধির হারের থেকে মূল্যস্ফীতি হার বেশি ছিল। সুতরাং যৌক্তিকভাবেই তারাও ন্যূনতম মজুরির সংস্কারের দাবি তুলতে পারেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমাদের মূল দায়িত্ব হলো সামষ্টিক অর্থনীতিকে চাঙা করে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ চাঙা করতে হবে।’

মূল্যস্ফীতি কি আরও বাড়বে?

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এ পরিমাণ অর্থ বাজারে এলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে কি না এমন প্রশ্নে সিপিডি সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গত ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীদের মূল্যস্ফীতি থেকে কম হারে বেতন বৃদ্ধি হয়েছে। তা ছিল ৫ শতাংশ হারে, যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯-১০ শতাংশ। সুতরাং ৯ম পে-স্কেল খুবই যৌক্তিক। এটার সাথে প্রত্যক্ষভাবে মূল্যস্ফীতির ওই রকম সম্পর্ক দেখি না।’

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার যদি অতিরিক্ত অর্থ জোগাতে অতিমাত্রায় নতুন টাকা সৃষ্টি করে তাহলে বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হবে।

অন্যদিকে সরকার যদি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো ও সুশৃঙ্খল বাজেট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পে-স্কেলের বাড়তি ব্যয় পরিচালনা করতে পারে তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলক কম থাকতে পারে।

মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নত করতে পারলে আমার মনে হয় না যে এটা দুশ্চিন্তার কারণ হবে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য এটা একটা প্রণোদনা হিসেবেও কাজ করবে। সুতরাং সামষ্টিক অর্থনীতিতেও এটার ইতিবাচক একটা প্রভাব পড়বে।’

বাজার ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না করে কেবল বেতন বাড়ালে তার সুফল দীর্ঘমেয়াদে টেকে না। সরকার যদি কঠোর বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে না পারে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের কারসাজি না থামায়, তবে সরকারি কর্মচারীদের জন্য পাওয়া এই আনন্দ সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হতে পারে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা যদি বিনিয়োগ চাঙা করতে না পারি, যদি আমাদের রিজার্ভের উপরে প্রেশার (চাপ) বেড়ে যায় এবং আমাদের এক্সচেঞ্জ রেট যদি অবনমন হয়, সেগুলোর কারণেও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।’