শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশনের মহাসচিবের অনিয়ম, বরখাস্ত কার্যকরী পরিষদ

এম আর খান শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ পরিচালনাকারী শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের কার্যকরী পরিষদ সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির মহাসচিব রেজা করিম ও কার্যকরী পরিষদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠলে প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আগামী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে, কার্যক্রম পরিচালনা এবং নতুন কার্যকরি পরিষদ গঠনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
গত ৮ অক্টোবর সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক মোস্তফা মোস্তাকুর রহিম খান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. খায়রুল ইসলামকে তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর আহ্বায়ক করা হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে মণ্ডলীর অন্য সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হবে। যেখানে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বিধি অনুযায়ী কার্যকরী পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত পরিষদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে আদেশে।
আদেশে বলা হয়েছে, শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশনের বর্তমান কার্যকরী পরিষদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এবং যশোর শিশু হাসপাতালের স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল ও অর্থ স্থানান্তরসংক্রান্ত পৃথক অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগ তদন্তে গত ২৯ জুলাই দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদন পর্যালোচনায় ফাউন্ডেশনের বর্তমান কার্যকরী পরিষদের অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়ায় স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী পরিষদটিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
অভিযোগের তালিকায় আর্থিক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি
শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন ও এম আর খান শিশু হাসপাতালের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা মহাসচিব রেজা করিম ও কার্যকরী পরিষদের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগে বিধি লঙ্ঘন, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবহারে অনিয়ম এবং কমিটি পরিচালনায় একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। অভিযোগপত্রে এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, কার্যকরী পরিষদ পরিচালনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া, প্রতিষ্ঠানের ফার্মেসি পরিচালনা, বিভিন্ন খাতে ব্যয় এবং আর্থিক হিসাব সংরক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, ফাউন্ডেশনের কিছু পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি ও নির্ধারিত যোগ্যতার নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ, পদায়ন ও চাকরি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে।
ফার্মেসি, অনুদান ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগপত্রে ফাউন্ডেশনের ফার্মেসি পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ফার্মেসি পরিচালনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি এবং ভাড়া ও ব্যবস্থাপনার কিছু সিদ্ধান্তে নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা সুবিধা পেয়েছেন। এ ছাড়া ফাউন্ডেশনের অনুদান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া আর্থিক সহায়তা এবং প্রকল্প ব্যয়ের হিসাব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের অর্থায়ন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে এসব অভিযোগের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, জনকল্যাণমূলক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অর্থ কোথা থেকে আসছে, কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে এবং তার বিপরীতে কী সেবা দেওয়া হচ্ছে তা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করেন অভিযোগকারীরা।
৩০ শতাংশ দরিদ্র রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসার শর্ত
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত নির্দিষ্ট হাসপাতাল ও সংস্থার মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের ৩০ শতাংশকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কার্যক্রম রয়েছে। ওই তালিকায় ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ, মিরপুর, ঢাকার নামও রয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ কার্যক্রমের আওতায় হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালের রোগী নিবন্ধন, ছাড়পত্র, বিল, বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়া রোগীর তালিকা এবং সরকারি অনুদান বা চুক্তির শর্ত মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। এতে দরিদ্র রোগীদের জন্য নির্ধারিত সুবিধা বাস্তবে কতটা নিশ্চিত হয়েছে, তা নির্ণয় করা সম্ভব হবে।
নতুন ব্যবস্থাপনায় ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন
সমাজসেবা অধিদপ্তরের আদেশে তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কার্যকরী পরিষদের কাছ থেকে দ্রুত দায়িত্ব বুঝে নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ, ১৯৬২ সালের বিধিমালা এবং প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদেশে আরও বলা হয়েছে, বিধি অনুযায়ী আগামী ৯০ দিনের মধ্যে কার্যকরী পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচনসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচিত পরিষদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে গৃহীত কার্যক্রমের প্রতিবেদন সমাজসেবা অধিদপ্তরে জমা দেবে।
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
তদন্তে পাওয়া সুনির্দিষ্ট অনিয়ম বা আর্থিক আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আসাফুদ্দৌলাহ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তদন্তে যেসব অনিয়ম পাওয়া গেছে, সে অনুযায়ীই প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।’
তবে কোন কোন অভিযোগের সত্যতা মেলায় কিংবা আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ কত, এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি একেবারেই গোপনীয় (কনফিডেনশিয়াল)। আমার পর্যায় থেকে এ নিয়ে কথা বলা ঠিক হবে না।’
প্রশাসনিক রদবদলের পর নতুন তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর কার্যক্রম অধিদপ্তর কীভাবে তদারকি করবে, জানতে চাইলে আসাফুদ্দৌলাহ বলেন, ‘এটি অধিদপ্তর নিজস্ব প্রশাসনিক দল দিয়ে তদারকি করবে। বিষয়টি সরাসরি সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের এখতিয়ারভুক্ত উল্লেখ করে তিনি জানান, আইন প্রয়োগ ও সার্বিক দেখভালের বিষয়টি অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায় থেকেই পরিচালনা করা হয়।
জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ায় বরখাস্ত করা হয়েছে। যারা এসব অনিয়ম ও দুনীতিতে জড়িত ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেটি তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলী বলতে পারবে। তবে সংস্থাটির কার্যক্রম ঠিকঠাক চলছে কিনা অধিদপ্তর নিয়মিত তদারক করবে।’

