logo
ঢাকা-টোকিও সম্পর্কে নতুন অধ্যায়

জাপানি বিনিয়োগে দেশে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

আতিক হাসান
আতিক হাসান, টোকিও থেকে
জাপানি বিনিয়োগে দেশে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: পিএমও

দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক এবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্কের পুরোনো অধ্যায়ে ছিল উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো নির্মাণ ও পারস্পরিক আস্থার গল্প। এবার সেই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে ঢাকা ও টোকিও। লক্ষ্য—বন্ধুত্বের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন, জাপানের বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের মানুষের জন্য অভিন্ন সমৃদ্ধির নতুন পথ তৈরি করা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক এবং যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা উঠে আসে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জাপানি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান।

অন্যদিকে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতে এক লাখ কোটি ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, রেলপথ, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর, কৃষি, মৎস্য, প্রতিরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই, জ্বালানি নিরাপত্তায় ঋণসহায়তা, মাতারবাড়ীকে ঘিরে শিল্প ও লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তব রূপ নির্ভর করবে বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়ন, প্রকল্পের অগ্রগতি, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন এবং দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর। যৌথ বৈঠক ও সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য এবং প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে সেই সহযোগিতার কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়েছে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় সম্ভাবনা

টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব কয়েক দশকের বন্ধুত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এখন এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যমান বিনিয়োগের সুযোগগুলো অনুসন্ধান করতে এবং আমাদের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে অংশীদার হতে আমি জাপানি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে তাঁর সরকার জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিনি বলেন, আমরা একসঙ্গে কাজ করলে আমাদের দুই মহান দেশের জন্য আরও সহনশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব।

যৌথ বিবৃতিতে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতে এক লাখ কোটি ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময়ে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশাও তুলে ধরা হয়েছে। তবে এটি সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রক্ষেপণ; পুরো অর্থের বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থান ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে—এমন নয়।

বাংলাদেশে উৎপাদনশিল্প, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। জাপানের পুঁজি, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি ও বাজারের সম্ভাবনার সমন্বয় হলে নতুন শিল্প স্থাপন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং দক্ষ কর্মী তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে।

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই

বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে ইপিএ সই হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ককে আরও কাঠামোবদ্ধ করা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যৌথ বিবৃতিতে চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দুই দেশ।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের এ-সংক্রান্ত অনুরোধ নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনার কথা জানিয়েছে জাপান।

এ ছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়নে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক বিনিময় হয়েছে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, রেলপথ ও অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশের অভিন্ন অঙ্গীকার রয়েছে।

তিনি আরও জানান, সফরকালে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও জাপান একাধিক সমঝোতা স্মারক বিনিময় করেছে। দুই দেশের আলোচনার ফলাফল ও অভিন্ন অগ্রাধিকার যৌথ বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে।

মাতারবাড়ীকে ঘিরে শিল্প ও লজিস্টিকস হাব

বাংলাদেশের অবকাঠামো ও শিল্পায়নে জাপানের সহযোগিতার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে মাতারবাড়ী। যৌথ বিবৃতিতে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-ব উদ্যোগকে ‘শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা যৌথ সমৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে জ্বালানি, শিল্প ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য শুধু বন্দর নির্মাণ নয়; বরং বন্দরকে ঘিরে শিল্প স্থাপন, পণ্য পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য সমন্বিত অবকাঠামো তৈরি করা।

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতি, ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যতে মাতারবাড়ী বন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।