logo

ছয় মাসে সাড়ে ৩ হাজার চিকিৎসককে বদলি

• সবচেয়ে বেশি বদলি হয়েছেন মেডিকেল অফিসাররা

• দুই-তৃতীয়াংশ বদলি ঢাকা ও আশপাশের জেলায়

• রাজনৈতিক ট্যাগ ও হয়রানির অভিযোগ

• পদায়নের সুপারিশ নিয়ে অধিদপ্তরে ভিড়

ছয় মাসে সাড়ে ৩ হাজার চিকিৎসককে বদলি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোগো। ছবি : উইকিপিডিয়া

সারা দেশে গত ছয় মাসে বদলি হয়েছেন ৩ হাজার ৩২৩ জন চিকিৎসক। এর মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি মেডিকেল অফিসাররা। বদলি হওয়াদের দুই-তৃতীয়াংশ গেছেন ঢাকা ও আশপাশের জেলায়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এসব বদলির পেছনে রাজনৈতিক ট্যাগ ও প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ সামনে আসছে।

বরগুনার একটি উপজেলা হাসপাতালে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন ডা. মাহফুজুর রহমান (ছদ্মনাম)। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ঢাকা মেডিকেলে পদায়ন হয়। স্ত্রী ঢাকার একটি উচ্চমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হওয়ায় এই বদলি ছিল তার জন্য স্বস্তির। তবে সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। চলতি বছরের আগস্টে আবারও বদলি করা হয় তাকে। এবার কর্মস্থল ফরিদপুর।

একই রকমের অভিজ্ঞতা ঢাকা মেডিকেলের স্পাইন সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শহীদুল ইসলাম আকনের। জুলাই অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গুলিবিদ্ধ আহতদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দিয়েছিলেন তিনি। চলতি বছরের এপ্রিলে তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে বদলি করা হয় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন করেন ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে বর্তমান সরকার। এর এক মাসের মাথায় ১১ মার্চ অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করা হয়। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গত ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বদলি হয়েছেন ৩ হাজার ৩২৩ জন চিকিৎসক।

ভুক্তভোগীদের দাবি, সরকার পরিবর্তন হলেও বন্ধ হয়নি প্রশাসনিক হয়রানি ও রাজনৈতিক বদলির পুরোনো চর্চা। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, চিকিৎসক সংকটের কারণে সংকটপ্রবণ এলাকায় জনবল বাড়াতেই এসব বদলি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কাঠামোয় বদলি হয় তিনটি ক্যাটাগরিতে। পার-২ ক্যাটাগরিতে রয়েছেন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রভাষক, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও), আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) এবং ষষ্ঠ গ্রেডের চিকিৎসকরা। এই ক্যাটাগরিতে গত ছয় মাসে বদলি হয়েছেন ৭২০ জন চিকিৎসক।

পার-৩ ও ৪ ক্যাটাগরিতে রয়েছে মেডিকেল অফিসার ও সহকারী রেজিস্ট্রারের মতো পদ। এই দুই ক্যাটাগরিতে বদলি হয়েছেন ২ হাজার ৬০৩ জন, যাদের বেশিরভাগই মেডিকেল অফিসার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে টানা তিন দিন সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পদায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিদিন সেখানে ভিড় করছেন চিকিৎসকরা। রাজনৈতিক দলের নেতা, চিকিৎসক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাবেক ও জ্যেষ্ঠ আমলাদের সুপারিশ নিয়ে আসছেন অনেকে।

বদলি হওয়া চিকিৎসকদের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি মেডিকেল অফিসাররা। অধিদপ্তরে প্রশাসনিক তিনটি কাঠামোয় বদলি কার্যকর হয়। প্রথম কাঠামো পার-২। এখানে রয়েছেন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রভাষক, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও), আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) এবং ষষ্ঠ গ্রেডের চিকিৎসকরা। গত ছয় মাসে এই ক্যাটাগরিতে বদলি হয়েছেন ৭২০ জন চিকিৎসক।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় কাঠামো পার-৩ ও পার-৪। এখানে রয়েছে মেডিকেল অফিসার ও সহকারী রেজিস্ট্রারের মতো পদ। দুই ক্যাটাগরি মিলিয়ে বদলি হয়েছেন ২ হাজার ৬০৩ জন। তাদের বেশিরভাগই মেডিকেল অফিসার। তিন ক্যাটাগরি মিলিয়ে মোট বদলি হয়েছেন ৩ হাজার ৩২৩ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ছয় মাসে বদলি হওয়া প্রায় সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসকের দুই-তৃতীয়াংশই গেছেন ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে। প্রায় ২ হাজার ২০০ চিকিৎসকের বদলি হয়েছে ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের জেলার হাসপাতালগুলোতে। বাকিদের বদলি হয়েছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অন্যান্য হাসপাতালে।

বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েও রাজনৈতিক কারণে বিগত পাঁচ বছর গেজেটভুক্ত হতে পারেননি ডা. তমাল আহমেদ (ছদ্মনাম)। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি গেজেটভুক্ত হন। প্রথমে পদায়ন হয় সিরাজগঞ্জের একটি উপজেলায়। পরে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এক মাসের ব্যবধানে দুই দফায় তাকে বদলি করা হয় সিরাজগঞ্জে।

ডা. তমাল আহমেদ বলেন, ‘পতিত সরকারের সময়ে বৈষম্যের শিকার হয়ে যোগদান করতে পারিনি। আর এখন শুধু রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে এক মাসের ব্যবধানে দুবার ঢাকার বাইরে পাঠানো হলো।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা মেডিকেলে পদায়ন হয় ডা. মেহেদী হাসানের। চার মাসের মাথায় জামায়াত ট্যাগ দিয়ে গাজীপুরে বদলি করা হয় তাকে। আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ডা. হাবিবুর রহমানকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে ঢাকা থেকে পাঠানো হয়েছে রাজশাহীর একটি উপজেলায়। ভুক্তভোগী চিকিৎসকরা এই ধরনের পদায়নকে দেখছেন পেশাগত হয়রানি হিসেবে।

সরেজমিনে টানা তিন দিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা ও আশপাশের জেলায় পদায়ন পেতে চিকিৎসকদের দীর্ঘ জটলা। পরিচালকের (প্রশাসন) কক্ষের সামনে দিনভর ভিড় জমাচ্ছেন তারা। বদলি ও পদায়ন নিশ্চিতে রাজনৈতিক দলের নেতা, চিকিৎসক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাবেক ও জ্যেষ্ঠ আমলাদের সুপারিশ নিয়ে এসেছেন অনেকে।

ময়মনসিংহের একটি উপজেলায় সাত বছর ধরে কর্মরত ডা. রোকসানা আঞ্জুম তার শ্বশুরকে (৮৩ ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত আমলা) নিয়ে এসেছিলেন ঢাকায় পদায়নের আশায়। তিনি বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় নিজে এসেছিলাম। শ্বশুরকে এনেও কাজ হলো না, খালি হাতে ফেরত যেতে হচ্ছে।’

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দীন মোহাম্মদ রুমী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সরকার যাকে যেখানে ভালো মনে করবে, তাকে সেখানে বদলি ও পদায়ন করা হবে। এটাই নিয়ম। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

যা বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘এসব বদলি নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ। গুরুত্বপূর্ণ পদে হয়তো দু-একটি পদে বদলির ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কোনো বদলি হয়নি।’

চিকিৎসক সংকটের কারণে এমন বদলি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে চিকিৎসক সংকট সামাল দিতে যেসব জায়গায় তুলনামূলক বেশি চিকিৎসক রয়েছেন, সেখান থেকে চিকিৎসকদের এনে সংকটপূর্ণ এলাকায় পদায়ন করে সমতা আনার চেষ্টা চলছে। চিকিৎসকদের নিজ জেলা বা বিভাগের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়, যাতে কর্মক্ষেত্রে জটিলতা না তৈরি হয়। তবে সব ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।’

রাজনৈতিক কারণে চিকিৎসকদের বদলি করা হচ্ছে; এমন দাবির বিষয়ে স্বাস্থ্য তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাউকে দূরে বদলি করা হয়েছে বলে মনে হয় না। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে বদলির বিষয়টি অনেক সময় শিথিল থাকে। অনেকেই ১০ বছর ধরে একই স্থানে; যেমন ঢাকায় কর্মরত আছেন। নিয়ম অনুযায়ী তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হলে নানা কথা ওঠে। হয়তো দু-একটি ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।’

চলমান পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বিদ্যমান চিকিৎসক সংকট অনেকটাই কেটে যাবে বলে জানান ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদের নতুন নিয়োগ নিয়ে সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) কাজ করছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও আবেদনের সময়সীমা সংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক নিয়ম রয়েছে। আশা করি, দ্রুত এ সংক্রান্ত ঘোষণা আসবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে।’