Advertisement

২৪ ঘণ্টায় এনআইডি সংশোধনের ফাঁদ, ভুয়া কর্মকর্তার খপ্পরে গ্রাহকরা

২৪ ঘণ্টায় এনআইডি সংশোধনের ফাঁদ, ভুয়া কর্মকর্তার খপ্পরে গ্রাহকরা
ছবি : গ্রাফিকস

১২ থেকে ২৪ ঘণ্টায় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এক কর্মকর্তার নাম ও ছবি ব্যবহার করে চালানো হচ্ছে এই প্রতারণা। সংশোধনের ধরনভেদে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায় করা হয় ৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। সংঘবদ্ধ এই চক্রের প্রতারণার শিকার বিপুলসংখ্যক গ্রাহক।

Advertisement

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আশাদুল হকের নাম ও ছবি দিয়ে খোলা হয় একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। সেখান থেকে জরুরিভিত্তিতে এনআইডি সংশোধনের পোস্ট দেওয়া হয়।

আগ্রহী কেউ ইনবক্সে যোগাযোগ করলে দেওয়া হয় কথিত আশাদুল হকের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। ওই নম্বরের প্রোফাইলে অ্যালবাম আকারে সেই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দাপ্তরিক বিভিন্ন ছবি যুক্ত করা হয়। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে ব্যবহার করা হয় আশাদুল হকের ছবিযুক্ত ভুয়া ভিজিটিং কার্ড।

কেউ যোগাযোগ করলে প্রথমে সমস্যার ধরন জেনে নেওয়া হয়। কাজ শুরুর আগেই বিকাশ বা নগদ এজেন্টের মাধ্যমে আদায় করা হয় একটি বড় অঙ্কের টাকা। প্রয়োজনীয় নথি ও অগ্রিম টাকা পাওয়ার পর প্রতারকরা নিজেরাই অনলাইনে আবেদন করেন এবং আইডি ও পাসওয়ার্ড নিজেদের কাছে রেখে দেন। পরে ফটোশপে বানানো ভুয়া এনআইডির পিডিএফ ও অনলাইন কপির ছবি পাঠিয়ে দেওয়া হয় গ্রাহককে।

অনেক ক্ষেত্রে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে গ্রাহকের এনআইডি প্রোফাইল সাময়িকভাবে লক করে দেওয়া হয়। পূর্ণ টাকা না পেলে প্রোফাইল আর খোলা হবে না বলে হুমকি দেওয়া হয়।

গ্রাহক সেজে অনুসন্ধান

জরুরিভিত্তিতে এনআইডি সংশোধনের প্রয়োজন দেখিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে চক্রটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এশিয়া পোস্টের এই প্রতিবেদক। নিজেকে উত্তম কুমার পরিচয় দিয়ে জানানো হয়, এনআইডিতে থাকা নাম ‘উত্তম চন্দ্র বর্মন’ পরিবর্তন করে ‘উত্তম কুমার’ করতে হবে।

প্রতারক ১২ ঘণ্টার মধ্যে কাজ শেষ করার আশ্বাস দিয়ে খরচ চান ৫ হাজার টাকা। রাতে যোগাযোগের সময় পরদিন সকালের মধ্যেই সংশোধিত এনআইডি হাতে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

নিজেকে ‘অফিসার’ দাবি করে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করেন প্রতারক। প্রমাণ হিসেবে পাঠান আশাদুল হকের বিভিন্ন ভঙ্গিতে তোলা ২০টিরও বেশি পুরোনো ছবি। বলেন, ‘আমরা অফিসার মানুষ। আমাদের সঙ্গে লেনদেন করলে কোনো সমস্যা নেই।’

ফাইল প্রসেসিংয়ের কথা বলে একটি নগদ নম্বরে ২ হাজার ৫০০ টাকা অগ্রিম দাবি করা হয়। কাজের নমুনা হিসেবে কয়েকটি আইডি কার্ডের ছবি ও পিডিএফ পাঠান তিনি, যেগুলো সম্পাদনা করা বলে নিশ্চিত হয়েছে এশিয়া পোস্ট।

পরিচয় নিশ্চিত করতে সরাসরি দেখা করা বা ভিডিও কলের প্রস্তাব দিলে ‘চাকরি চলে যাবে’ বলে তা প্রত্যাখ্যান করেন কথিত আশাদুল হক। একপর্যায়ে বিশ্বাস না হলে অন্য কোথাও যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

সমস্যার ধরন বুঝে বাড়ে টাকার অঙ্ক

এনআইডির সমস্যার জটিলতা অনুযায়ী চক্রটি ভিন্ন ভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করে। সাধারণ নাম সংশোধনে দাবি করা হয় ৫ হাজার টাকা। বয়স সংশোধনের মতো তুলনামূলক জটিল কাজে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়।

ঝুলে থাকা আবেদন অনুমোদনের জন্য নির্ধারিত রেট ১২ হাজার টাকা। দরকষাকষির সুযোগ থাকলেও প্রশাসনিক ঝামেলা মেটানোর কথা বলে আগাম টাকা আদায় করা হয়। শুরুতেই বিকাশ বা নগদ এজেন্ট নম্বরে মোট টাকার ৫০ শতাংশ নিয়ে নেয় প্রতারকচক্র।

ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা

এনআইডি সংশোধনের নামে প্রতারকচক্রের এমন জালিয়াতির শিকার অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে এশিয়া পোস্ট। তাদের একজন মাদারীপুরের আশিক সরদার। তিনি বলেন, ‘আমি ফেসবুক পোস্ট দেখে এনআইডি সংশোধনের জন্য টাকা দিয়েছিলাম। বিদেশে যেতে আমার বয়স বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। শুরুতে ৩৫ হাজার টাকা চাইলেও ১৬ হাজার টাকায় ফাইনাল হয়। প্রথমে অগ্রিম হিসেবে ৪ হাজার টাকা দেই। কিন্তু অনেক দিন ঘোরাতে থাকে। পরে চাপ দিলে বলে, আরও টাকা না দিলে কাজ হবে না। আরও ৪ হাজার টাকা দিলে আমাকে একটা পিডিএফ দেয়। সেখানে দেখা যায়, বয়স সংশোধন হয়ে গেছে। আমিও মনে করি হয়ে গেছে। তবে যখন পাসপোর্ট বানাতে যাই, তখন দেখি সার্ভারে কোনো তথ্য সংশোধন হয়নি। পরে আবার যোগাযোগ করলে আমাকে ব্লক করে দেয়।’

একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন ইউপি সদস্য সাজ্জাদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘এসএসসি ২০০৭-০৮ ব্যাচের একটি ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দেখে যোগাযোগ করি। আমার এলাকার এক ছোট ভাইয়ের বয়স সংশোধনের জন্য ১২ হাজার টাকা দিলেও শেষ পর্যন্ত অনলাইনে কোনো তথ্য পরিবর্তন হয়নি।’

শাহিন নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘এনআইডি সংশোধনের জন্য ৮ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। টাকা পাওয়ার পর আমার এনআইডি প্রোফাইল লক করে দেয়।’

বিপাকে আসল কর্মকর্তা

যার নাম ও ছবি ব্যবহার করে এই প্রতারণা চলছে সেই মো. আশাদুল হক নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে কর্মরত আছেন গত ১১ বছর ধরে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘২০২৩ সালের মার্চ থেকে একটি চক্র আমার ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য চুরি করে এই অপকর্ম চালাচ্ছে। এ বিষয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় তখনই জিডি করেছি। আমি এনআইডি সংশোধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা নই। এমনকি চক্রটি আমার এনআইডি ব্যবহার করে পূবালী ব্যাংকে একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে লেনদেন করেছে।’

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন জায়গা থেকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই প্রতারণার বিষয়ে জানতে পারি। এসব শুনে নিজেও বিব্রত হই। তারা (চক্রের সদস্য) শাস্তির আওতায় এলে মানুষ প্রতারণার হাত থেকে বেঁচে যেত।’

যা বলছে কর্তৃপক্ষ

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এ ধরনের চক্রগুলো কখনও শনাক্ত করা যায়, কখনও যায় না। আমাদের কাছে অভিযোগ এলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’