ইশরাকের সঙ্গে অস্ত্রসহ কারা ছিলেন, খোঁজ নিচ্ছে পুলিশ

রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘরে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন ও তার সহযোগীদের ব্যবহৃত অস্ত্রের বিষয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। ওই অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করে তাদের ব্যবহার করা অস্ত্রের বৈধতা নিয়ে এরইমধ্যে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানের সময় ইশরাকের পাশাপাশি তার সঙ্গে থাকা আরও একজনের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, শনিবারের (১৭ অক্টোবর) ওই অভিযানে অংশ নেওয়া প্রায় সবার কাছে ছোট আকারের আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। মোট কতগুলো এবং কী ধরনের অস্ত্র ছিল, তা খুঁজে বের করা চেষ্টা চলছে।
কারও হাতে থাকা অস্ত্র লাইসেন্সকৃত হলেও সেটি দেখিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা আইনসম্মত কি না? এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের সুযোগ রয়েছে কি না? এসব বিষয় নিয়ে পুলিশের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
সূত্র বলছে, অভিযানে কী ধরনের অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়েছে, কতজন এতে অংশ নিয়েছেন এবং তাদের পরিচয় কী; এসব তথ্য উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে পুলিশ। ওয়ারী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে এটি ডিএমপি সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে স্থানীয় কিছু নেতাকর্মীর ইশরাকের মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, আলোচনায় আসার উদ্দেশ্যে ইশরাকের পরিকল্পনায় এই অভিযান চালানো হয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে বাহবা কুড়ানোর আকাঙ্ক্ষাও ছিল।
অভিযানের আগে ইশরাক লোক পাঠিয়ে খোঁজ নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী মাদকসেবীরা জড়ো হলে আকস্মিকভাবে সেখানে হাজির হন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে নিজস্ব ক্যামেরাপারসনসহ পর্যাপ্ত লোকজন ছিল।
ইশরাকের সঙ্গে ছিলেন যারা
মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাকের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ও সহযোগিতা ছিল। কেউ সরাসরি তার সঙ্গে ছিলেন, আবার কেউ স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতা ও প্রটোকলের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের একজন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি পাভেল শিকদার। তিনি টিকাটুলির সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজের সামনের এলাকায় থাকেন। অভিযানের সময় তার কাছে শর্টগান ছিল। একটি ভিডিওতেও তাকে অস্ত্রসহ দেখা গেছে। তবে অস্ত্রটির বৈধতা বা কোনো আইনগত নথি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযানের সময় পাভেল শিকদারের সঙ্গে ছিলেন ওয়ারী থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মামুন। ইশরাকের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সেন্টু ওরফে ‘পেট্রোভেরা’র নামও এসেছে। তিনি অস্ত্রসহ ইশরাকের প্রটোকল ও স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতার দায়িত্ব পালন করেন। তার বাসা টিকাটুলির কে এম দাস লেন এলাকায়।
৩৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের আহ্বায়ক সোয়েব ও একই ওয়ার্ডের সদস্যসচিব জোয়েবের নামও এসেছে। দুজন থাকেন গোপীবাগ থার্ড লেন এলাকায়। সূত্র বলছে, অভিযানের সময় স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সহযোগিতা ছিল।
গোপীবাগের ডিম গলির রেললাইনের পেছনে মসজিদসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক তুহিন। সেদিনের ঘটনায় তার নামও সামনে এসেছে।
যা বলছেন ইশরাক ও পুলিশ
পাভেল শিকদারের হাতে থাকা অস্ত্রের বিষয়ে ইশরাক বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত নামে দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে। একটি থ্রি-টু বোরের পিস্তল, আরেকটি হলো রাইফেল। বৈধভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়ে আমি নিয়েছি। আমি আপনাদের ইতিপূর্বে বলেছি যে, ওই জায়গাটিতে পুলিশ সদস্য পর্যন্ত যেতে ভয় পায়, কারণ ছাদ থেকে গুলি করা হয়। আমাদের ভলান্টিয়াররাও মানুষ, তাদের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট নেই। তাই আইনসম্মত নিয়ম জেনেই আমার গাড়িতে করে দুটি অস্ত্র নিয়ে এসেছি। আমার দ্বিতীয় অস্ত্রটি একজন সহকর্মীর কাছে রাখতে দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘যার নামে লাইসেন্স রয়েছে, সে যদি উপস্থিত থাকে এবং যে রাখবে, তারও যদি লাইসেন্স থাকে, তবে সে তা সাময়িকভাবে ধারণ করতে পারে; এটি জেনেই আমি এভাবে অস্ত্র নিয়ে এসেছি।’
ইশরাক বলেন, ‘নির্বাচনের পর থেকে থানা ও ডিসিসহ সকল পর্যায়ে বহু অনুরোধ সত্ত্বেও কেউ কিছু করতে পারেনি। আমি এই পদক্ষেপটি নিয়েছি, কারণ আমার এলাকার জনগণ ও ভোটারদের একটি মারাত্মক চাপ ছিল আমার ওপর। হয় আমাকে সেখানে অভিযানের কো-অর্ডিনেশন করে নেতৃত্ব দিতে হতো, অথবা প্রমাণ হতো যে সেখান থেকে আমার কোনো স্বার্থ রয়েছে। তাই আমি মনে করি, সঠিক উপায়ে যথাযথভাবেই কাজটি করেছি। আমি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেখেছি এবং সকলকে বলেছি, যেন কারও গায়ে একটা টোকাও না পড়ে এবং সবাইকে যেন আইনের হাতে তুলে দেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘এটি বৈধ অস্ত্র ছিল, যা আমি আমার নিরাপত্তার জন্য হাতে রেখেছিলাম। পরবর্তীতে তাও থাকবে না, খালি হাতেই যাব, ইনশাআল্লাহ। আমরা কাউকে ভয় করি না; আন্দোলন, সংগ্রাম ও লড়াই করে খুনি হাসিনার গুলির সামনে দাঁড়িয়ে থেকে আজকে আমরা এখানে এসে পৌঁছেছি। বাংলাদেশের জনগণ আমাদের ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। তাই আমরা সকল ধরনের অপপ্রচারকে রুখে দিয়ে আগামী দিনে বাংলাদেশকে সুখী ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করে যাব।’
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় থানা ও ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয় থেকে সরাসরি তদারকি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি প্রতিবেদনও পাঠানো হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ডিবিকে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।’
ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) আকতার হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে ডিবি প্রধান স্যার গতকাল (রোববার) প্রেস ব্রিফিংয়ে যতটুকু তথ্য দিয়েছেন, সেটুকু তথ্যই শুধু আমার কাছে আছে।’
প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়টা পুরোপুরি জেনে তারপর বলতে হবে। তদন্তের প্রেক্ষিতে বলতে হবে কার কী ভূমিকা ছিল, তার ওপর। তদন্ত হচ্ছে।’

