এবার সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা

পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকার পরও পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। দাম না বাড়াতে বাণিজ্যমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও চক্রটি বাজারে তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় খুচরা বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। বাজার থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেল একপ্রকার গায়েব হয়ে গেছে। এই সুযোগে খোলা সয়াবিন তেল নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে বিপাকে পড়ছেন সব শ্রেণির ক্রেতা।
জানা গেছে, চলতি মাসের শুরুতে সয়াবিন তেলের দাম বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় মিল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। চিঠিতে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ থেকে ২০৭ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৯৫৫ টাকা থেকে এক হাজার ২০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়।
এ ছাড়া খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে ১৮৫ টাকা, পাম তেল ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতিলিটার ১৭৭ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়। সরকার প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই তারা তাদের প্রস্তাব করা দাম কার্যকরের ঘোষণা দেয়। বাধ্য হয়ে গত ১২ এপ্রিল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে দাম না বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। কিন্তু মন্ত্রীর ওই নির্দেশনার ১১ দিনেও বাজারে সয়াবিন তেল সরবরাহ বাড়েনি। উল্টো সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে। যদিও অধিকাংশ জায়গায় বেশি দামেই তেল বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর বাড্ডা এলাকার গুদারাঘাট বাজারের পাঁচটি দোকানের চারটিতে বোতল সয়াবিন তেলের সংকট দেখা গেছে। এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। পাঁচ লিটারের কয়েকটি বোতল বিক্রি করতে দেখা যায়। নয়াবাজার, কারওয়ান বাজারসহ আরও বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে।
ক্রেতারা বলছেন, রোজার ঈদের আগেই বাজারে খোলা তেলের কেজি ২০০ টাকা ছাড়িয়েছিল। ঈদের পর গত কয়েক দিনে সেটি আরও বেড়ে ২১০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত তেল তো পাওয়াই যাচ্ছে না।
নয়াবাজারের মুদি ব্যবসায়ী তুহিরন বলেন, রমজানের শুরুতেই কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ২০ কার্টন চাহিদা দিলে দুই থেকে তিনি কার্টন দিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিগুলো ডিলারদের মাধ্যমে এমন কারসাজি করছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। পাঁচ থেকে ছয়টি কোম্পানির প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত।
কারওয়ান বাজারের তীর ব্র্যান্ডের ডিলার এটিএন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম বলেন, রোজায় তীরের তেলের বেশ সংকট ছিল। স্বাভাবিক সময়ে দুই থেকে আড়াইশ কার্টন তেল পেতাম। সেখানে তখন কোম্পানি মাত্র ৫০ কার্টন তেল দিত। সেজন্য খুচরায় তেল সরবরাহ কমিয়ে দিতে হয়েছিল। তবে ঈদের আগে সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও এখন আবার সরবরাহ কমেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টিকে গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম টনপ্রতি ১ হাজার ৩৭০ ডলার, যা আগে ১ হাজার ১০০ ডলার ছিল। যখন ১ হাজার ১০০ ডলার ছিল, তখন দেশে দাম সমন্বয় হয়েছে। এখন বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় তা ফের সমন্বয় করতে হবে। কারণ বাজারে কয়েক মাস ধরে লোকসান গুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, দেশের চার থেকে পাঁচটি বড় কোম্পানি সয়াবিন তেলের বাজারের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। বাকি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অন্য ছোট কোম্পানিগুলো সরবরাহ করে।
তিনি আরও বলেন, বড় কোম্পানি দেশের চাহিদামতো তেল আমদানির পর রিফাইন করে বাজারে ছাড়ে। বাড়তি মুনাফা করতে তারা বছরের একেক সময় তাদের ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। সরকারকে চাপে ফেলে সাধারণ ভোক্তাকে জিম্মি করে মূল্য বাড়িয়ে নেয়। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বর্তমানে বাজারে ১ লাখ ৭০ হাজার টন তেল মজুত আছে। আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পাইপলাইনে রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ কারণে সরকার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সরকার ভোক্তা স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে এই সময়ে যেন কোনো পণ্যের দাম না বাড়ে। সেটিকে লক্ষ্য হিসেবে নিয়ে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নেব।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর