logo

পদত্যাগের আগের রাতেই জিনিসপত্র নিয়ে অফিস ছাড়েন রাশেদ মাকসুদ

বিএসইসি
পদত্যাগের আগের রাতেই জিনিসপত্র নিয়ে অফিস ছাড়েন রাশেদ মাকসুদ
খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। ছবি : সংগৃহীত

পদত্যাগের আগের রাতেই ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে অফিস ছাড়েন বিএসইসির সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। পরদিন বৃহস্পতিবার (৪ জুন) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।

বুধবার কমিশন সভা শেষ করে বিদায়ের প্রস্তুতি নেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। গুঞ্জন রয়েছে, দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি হিসেবে ইতোমধ্যেই সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান থাকাকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দেয় বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর এসোসিয়েশন (বিসিএমআইএ)।

চলতি বছরের ১২ এপ্রিল আবারও এ নিয়ে দুদকের শরণাপন্ন হয় সংগঠনটি। দুদক চেয়ারম্যান বরাবর লেখা এক আবেদনে খন্দকার রাশেদ মাকসুদের বিভিন্ন অনিয়ম, সরকারি তহবিল তছরুপ ও দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্তের আহ্বান জানানো হয়।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আইনি জটিলতা এড়াতে বর্তমানে পড়াশোনার জন্য নিউজিল্যান্ডে থাকা ছেলের কাছে চলে যেতে পারেন তিনি।

বৃহস্পতিবার সংস্থার চার কমিশনারসহ পদত্যাগ করেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। বিএসইসি সূত্র জানায়, কমিশনের বৈঠক শেষ হওয়ার পর রাত ৮টার দিকে তারা অফিস ত্যাগ করেন। এ সময় নিজ নিজ কক্ষে থাকা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে করে নিয়ে যান।

আজ পুঁজিবাজারের স্টেকহোল্ডার ও সাংবাদিকদের নিয়ে ঈদ পুনর্মিলনী হওয়ার কথা থাকলেও সকাল ১০টার দিকে তা বাতিল করা হয়। এরপর বেলা ১১টার দিকে পদত্যাগ করেন চেয়ারম্যানসহ কমিশনাররা।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় পদগুলোতে রদবদল করা হয়। তবে বিএসইসি ছিল এর বাইরে। গত মঙ্গলবার এক সেমিনারে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, দু-এক সপ্তাহের মধ্যেই বিএসইসির নতুন চেয়্যারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে। মন্ত্রীর ওই ঘোষণার পর বুধবার তড়িঘড়ি করে কমিশন সভা আয়োজন করে রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন। সভায় কমিশনের মুখপাত্র আবুল কালামকে পদোন্নতি দিয়ে নির্বাহী পরিচালক করা হয়।

বিএসইসিতে নিজের মেয়াদকালে শেয়ার কারসাজির দায়ে বড় বিনিয়োগকারীদের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা জরিমানা করেন রাশেদ মাকসুদ। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এসব জরিমানা করা হয়। ১৯৯৩ সালে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে পুঁজিবাজারে এটিই সবচেয়ে বড় শাস্তির ঘটনা। যদিও শেষ পর্যন্ত ওই জরিমানার অর্থ খুব কমই আদায় করা সম্ভব হয়েছে।

জরিমানার মাত্র দশমিক ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৫ দশমিক ২৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। দণ্ডিত অনেক বিনিয়োগকারী অর্থ পরিশোধ না করায় এবং কেউ কেউ উল্টো এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করায় ওই পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অন্যদিকে জরিমানার কারণে বড় বিনিয়োগকারীদের অনেকে পুঁজিবাজার-বিমুখ হয়ে পড়েন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিএসইসির দায়িত্ব পান স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদ মাকসুদ। তবে প্রায় দুই বছরের মেয়াদে শেয়ারবাজারে বড় কোনো আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) আসেনি। মার্জিন রুলস ইস্যুর মাধ্যমে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যবসা সংকুচিত করে দেওয়া হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী, ব্রোকারেজ হাউস নতুন কোনো বিনিয়োগকারীকে ঋণ দিচ্ছে না।

সাধারণত বিনিয়োগকারীরা ব্রোকারেজ হাউস থেকে মার্জিন ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু নতুন নিয়মের কারণে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদ থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগের খবরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একধরনের স্বস্তি পরিলক্ষিত হয়েছে।

জানতে চাইলে বালাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘১৮ মাস ধরে এই লোকটার পদত্যাগের জন্য আন্দোলন করছি। যেকোনো মূল্যে এই কমিশনকে সরানো হোক, এটা আমাদের দাবি ছিল।’

অবশেষে সেই দাবি পূরণ হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তবে তার অভিযোগ, গত ১৮ মাসে পুঁজিবাজারে বড় অঙ্কের ‘ক্যাপিটাল লস’ হয়েছে, যার দায় সংশ্লিষ্টদের ওপর বর্তায়।

ইকবাল হোসেন আরও বলেন, ‘এই ১৮ মাসে সাবেক চেয়ারম্যান যে পরিমাণ ক্ষতি করেছেন, তাতে বিনিয়োগকারীদের নানামুখী সংকটের মধ্যে পড়তে হয়েছে। এই কমিশনের পদত্যাগের ফলে বাজার-সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে। আশা করি, নতুন কমিশন দায়িত্ব নিলে পুঁজিবাজার স্থবিরতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে।’

মার্জিন রুল এবং মিউচুয়াল ফান্ড-সংক্রান্ত বিষয়ে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে শেয়ারবাজারকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথাও জানান এস এম ইকবাল হোসেন।