logo
Advertisement

জাবির ৩২ গবেষণাপত্র প্রত্যাহার, মান ও সততা নিয়ে প্রশ্ন

এশিয়া পোস্ট নিউজ, জাবি
জাবির ৩২ গবেষণাপত্র প্রত্যাহার, মান ও সততা নিয়ে প্রশ্ন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি : সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিভিন্ন গবেষণা সাময়িকী (জার্নাল) থেকে বৈজ্ঞানিক জালিয়াতি, গবেষণায় অনিয়ম ও অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ১৮ জন শিক্ষক ও চারজন শিক্ষার্থীসহ ২২ জনের মোট ৩২টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার (রিট্র্যাক্ট) করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান, বৈজ্ঞানিক সততা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে চরম বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে

Advertisement

আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের তথ্য সংরক্ষণ ও প্রকাশকারী সংস্থা ‘রিট্র্যাকশন ওয়াচ’-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্প্রিঞ্জার, এলসেভিয়ার, ওয়াইলি, প্লস ওয়ান ও আইইইইয়ের মতো স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে জাবির এসব গবেষণা নিবন্ধ প্রত্যাহার করা হয়। এর পেছনে মূলত ভুয়া পিয়ার রিভিউ, সাইটেশন অনিয়ম, উপাত্তের (ডাটা) বিকৃতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা কম্পিউটার-জেনারেটেড কনটেন্টের অসদ ব্যবহার এবং ‘পেপার মিল’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিম্নমানের কাজ প্রকাশের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে।

সবচেয়ে বেশি প্রত্যাহার পরিবেশবিজ্ঞান ও গণিত বিভাগে

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি বিভাগ ও একটি অনুষদের গবেষকরা এতে যুক্ত। এর মধ্যে পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের একক ও যৌথভাবে করা সর্বোচ্চ ১০টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কবির উদ্দিনের প্রত্যাহার হয়েছে দুটি নিবন্ধ।

এ ছাড়া গণিত বিভাগের চার শিক্ষকের মধ্যে অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলমের তিনটি, সহকারী অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের দুটি এবং অধ্যাপক ড. আবেদা সুলতানা ও অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় কুমার পণ্ডিতের যৌথভাবে করা একটি নিবন্ধ ‘জার্নাল অব ইন্টেলিজেন্ট অ্যান্ড ফাজি সিস্টেমস’ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

অন্যান্য বিভাগের মধ্যে পাবলিসিটি ও পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেনের দুটি, অধ্যাপক ড. মাহফুজা মোবারক ও অধ্যাপক ড. মো. তাজউদ্দিন সিকদারের একটি করে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়। বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সোহেল ও সহকারী অধ্যাপক নাফিসা নাওয়াল ইসলামের একটি করে নিবন্ধ বাতিল হয়েছে।

একই সঙ্গে সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মুশফিক আনোয়ার, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এ মামুন ও অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম, রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এনামুল হক, পরিসংখ্যান ও ডেটা সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শওকত হোসেন এবং ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অধ্যাপক ড. কে এম জাহিদুল ইসলামের একটি করে গবেষণাপত্র বাতিল করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল।

শিক্ষকদের পাশাপাশি জাবির চার প্রাক্তন শিক্ষার্থী—মো. নাজমুল ইসলাম প্রত্যয় (বায়োটেকনোলজি), মো. ইস্তিয়াক রহমান (পাবলিক হেলথ), মিনহাজ আবদুল্লাহ আল মুইদ (ফার্মেসি) এবং জাহিদুর রহিমের (প্রাণিবিজ্ঞান) নাম যুক্ত থাকা একাধিক গবেষণাপত্রও প্রত্যাহৃত হয়েছে।

‘সমস্যা কোথায় জানি না, তবে দুঃখিত’

মাইক্রোপ্লাস্টিক, চা-পাতা ও কোভিডের ইকোটক্সিকোলজিসংক্রান্ত নিবন্ধে তথ্যের অনিয়ম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অভিযুক্ত অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কোথায় সমস্যা হয়েছে, তা আমি সঠিকভাবে জানি না। তবে এই ঘটনার পর আমি সতর্ক হয়েছি এবং বিষয়টির জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।’

শিক্ষকদের ক্ষোভ ও নীতিমালার দাবি

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গবেষক ও শিক্ষক জানান, অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় জাবিতে এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক। গবেষণার মান বজায় রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘একাডেমিক সততা নীতিমালা’ না থাকাতেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কবিরুল বাশার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘র‌্যাংকিং বা সাইটেশনের অন্ধ দৌড়ে শামিল হতে গিয়ে গবেষণার গুণগত মান বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। এ জাতীয় অসাধু প্রতিযোগিতা প্রকৃত ও মেধাবী গবেষকদের ক্ষতি করছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।’ অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় ব্যর্থ হলে সরাসরি ব্যবস্থা নেবে ইউজিসি

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ জানান, জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে ইউজিসি নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরাসরি কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।