Advertisement

চার ক্যাম্পাসে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
চার ক্যাম্পাসে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

রাজধানীর তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, মারধর ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সংঘটিত এসব ঘটনায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

এদিকে আজ বিকেল পৌনে ৫টার দিকে এসব ঘটনায় আহত চিকিৎসাধীন শিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের মহানগর দক্ষিণের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ সময় কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা যৌথ মিছিল নিয়ে আসার পর এ হামলা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর আগে গতকাল সোমবার (৩ আগস্ট) রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই অভ্যুত্থান উপলক্ষে ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ প্রদর্শনীতে শিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রদলের নেতাদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। পরে তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আজ সকালের দিকে প্রথম উত্তেজনার সৃষ্টি হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটি সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের ধাক্কাধাক্কি এবং পরে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মারামারির ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে অংশ নিতে জকসু ও ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাদের বাগবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরে সেমিনার শেষে শহীদ মিনারের সামনে দুপক্ষের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ বাধে।

এ সময় জকসু ও ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়ে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। অন্যদিকে কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হওয়ার দাবি করেছে ছাত্রদল।

জকসু ভিপি ও শিবির নেতা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রক্টোরিয়াল টিম শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেয়। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে শিক্ষার্থী, জকসু সদস্যদের মারধর করেন। এ সময় আমি শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গেলে আমার জামা ছিঁড়ে টেনেহিঁচড়ে ক্যাম্পাস থেকে তারা আমাকে বের করে দেয়।’

জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহিন মিয়া অভিযোগ করেন, সেমিনার শেষে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়ে জকসুর ভিপি, জিএস, এজিএস ও ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখকে বেধড়ক মারধর করেছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ইউজিসির চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানকে ঘিরে ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এতে ছাত্রদলেরও বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছে।

ঢাকা কলেজ

মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাসে মিছিল বের করেন।

ছাত্রশিবিরের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গ্যালারি-২-এ শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালান। এতে শিবিরের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাখা অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেককে মাথায় আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

অন্যদিকে শিবিরের বহিরাগত নেতা-কর্মীরা সকালে ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে উসকানিমূলক আচরণ করে বলে দাবি করেন ঢাকা কলেজ ছাত্রদল। ছাত্রদলের এক কর্মীকে মারধর করার জেরেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় বলে জানায় সংগঠনটি।

ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাদ হোসেন বলেন, ‘শিবির সুপরিকল্পিতভাবে হামলার চেষ্টা করেছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে তারা অবস্থান নিয়েছেন।’

ঘটনার পর ঢাকা কলেজের মূল ফটকের সামনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল শুরু করলে এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কলেজ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবস্থান নেয়।

ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা

বিকেলের দিকে রাজধানীর বকশিবাজারে অবস্থিত ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। আহত দুই ছাত্রদল নেতা ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

আহত শিক্ষার্থীরা হলেন মাদ্রাসাটির ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ (৩০) ও লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিছার উদ্দিন রাব্বি (২৭)।

আহত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে জানান, তারা মাদ্রাসার ছাত্র নন। তবে সেখানে তার অনেক বন্ধুবান্ধব রয়েছে। তাদের সঙ্গে বিকেলে মাদ্রাসা চত্বরে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। তখনই শিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। লাঠিসোঁটা দিয়ে পেটায় এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, সানাউল্লাহর দুই পা, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ ছাড়া রাব্বির বাঁ পায়ে ইটের আঘাত এবং পড়ে গিয়ে বাঁ হাতে আঘাত পেয়েছেন। তাদের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পর ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।

এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল, শিবির, ছাত্রশক্তির সংঘর্ষের ঘটনার জেরে ন্যাশনাল মেডিকেলে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন শিবির ও ছাত্র শক্তির নেতাদের ওপর আবার হামলা করেছে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের মহানগর দক্ষিণের নেতাকর্মীরা।

বিকাল পৌনে ৫টার দিকে তারা হাসপাতালে প্রবেশ করে। হাসপাতালের বাইরে ও জরুরি বিভাগের চিকিৎসাধীন থাকা নেতাকর্মীদের মারধর করে। জরুরি বিভাগের ভেতর থেকে একজন বাইরে বের করে এনে মারধর করে। এ সময় কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন বলে জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে তারা।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

এর আগে গতকাল সোমবার (৩ আগস্ট) রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) জুলাই অভ্যুত্থান উপলক্ষে ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ প্রদর্শনীতে শিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রদলের নেতাদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। এদিকে ছাত্রদলের ওপর আগে হামলা করা হয়েছে বলে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

রাত ৮টার দিকে স্বাধীনতা স্মারক মাঠে ছাত্রদল ও শিবিরের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংঘর্ষ চলছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ প্রদর্শনীতে বেরোবি শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা গিয়ে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াত নেতাসহ সাকা চৌধুরীর বিচারিক হত্যাকাণ্ডের শিকার নামক ব্যানারটি সরাতে বলেন। পরবর্তীতে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে হামলা পাল্টা হামলা শুরু হয়। পরে ছাত্রদল গাছের ডাল ভেঙে ও শিবিরচেয়ার দিয়ে পরস্পরকে হামলা করে।

এ সময় শাখা ছাত্রদলের স্ট্যাম্পের আঘাতে শিবির নেতা মেহেদী হাসান আহত হন। অপরদিকে শিবিরের হামলায় ছাত্রদলের সহসভাপতি আশিকুর রহমান আহত হন। এ ছাড়া উভয় দলের আরও কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. ফেরদৌস রহমান এশিয়া পোস্টকে গতকাল বলেন, যারা এই মারামারির পেছনে জড়িত, তাদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে অতি শীঘ্রই বিচার করব। আমরা মনে করে, এখানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ইন্ধন রয়েছে।